ডিএমপির এক বিরল এসআই শহীদুল

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সরকারি সব অফিসে বদলি নিয়মিত কাজের অংশ। এখানে একই পদমর্যাদায় দীর্ঘ বছর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে অসংখ্য মানুষের। তবে একাধিক পদোন্নতি নিয়েও দীর্ঘ ২৬ বছর একই চেয়ারে অফিস করার এক বিরল রেকর্ড গড়লেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অর্থ বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শহীদুল হক খান। এই সময়ে ডিএমপির ১৭ জন কমিশনার বদল হয়েছেন। বর্তমানে ১৮তম কমিশনারের অধীনে দায়িত্বপালন করছেন তিনি।

ডিএমপির গোয়েন্দাসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালে ডিএমপিতে বদলি হওয়ার পর এখন পর্যন্ত শহীদুলের ৮-১০ বার বদলি আদেশ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই অজানা কারণে সেই বদলি আদেশ স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। এভাবেই অনেক কমিশনার ও আইজিপি পার করেছেন তিনি। এসআই পদমর্যাদার কোনো পুলিশ সদস্যের জন্য সদরদপ্তর থেকে একক অফিস আদেশ বাহিনীতে নজিরবিহীন ঘটনা। কিন্তু শহীদুলের বিষয়ে সেটা নিয়মিত ঘটনা। শহীদুলের বর্তমান শক্তির উৎস হিসেবে ঢাকার বাইরে থেকে কাজ করছেন একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা।

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের হাতে আসা কিছু কাগজপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছরের ১ জুন এসআই শহীদুলকে প্রশাসনিক কারণে সিলেট রেঞ্জে বদলি করে পুলিশ সদরদপ্তর। কিন্তু আদেশ অমান্য করে যোগদান করেননি এই কর্মকর্তা। সর্বশেষ ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর আবার একটি আদেশ দেয় পুলিশ সদরদপ্তর। ৮ ডিসেম্বর থেকে তাকে তাৎক্ষণিক অবমুক্তির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ডিএমপির জন্য কি এমন অপরিহার্য হয়ে পড়েছেন শহীদুল, সেটা বুঝে উঠতে পারছে না কর্মকর্তারাও। এমনকি ডিএমপির অর্থবিভাগ বা কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিস থেকেও তাকে অবমুক্ত করা হয়নি।

এসব অফিস আদেশের মধ্যেই অদৃশ্য কারণে পুলিশ সদরদপ্তর ১৪ ডিসেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তিতে এসআই শহীদুলের সিলেট রেঞ্জের বদলি আদেশ চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করে। সেই আদেশ ডিএমপি কমিশনার ও সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর পাঠায় সদরদপ্তর। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অফিস আদেশের একটি কপি পাঠানো হয় ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনারের (অর্থ) কাছে। স্থগিত আদেশের সময় শেষ হওয়ার পরও গত এক মাস ডিএমপিতে নিয়মিত অফিস করছেন তিনি। এমনকি গত বছরের ১ জুন থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাস কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে প্রশাসনিক বদলির আদেশের তোয়াক্কা না করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ আনা হয়নি। তিনি অগের জায়গাতেই বহাল রয়ে গেছেন।

জানা গেছে, এসআই শহীদুলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ডিএমপির ইন্টেলিজেন্স বিভাগ একাধিকবার প্রতিবেদন দিলেও তা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এসআই শহীদুলের অপকর্মের বিরুদ্ধে ডিএমপির মেট্রো ইন্টেলিজেন্স বিভাগ থেকে একটি গোপনীয় প্রতিবেদন ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) বরাবর পাঠানো হয়। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ডিএমপির এক ডিসি পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ডিএমপি সদরদপ্তর। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি ডিএমপির পিএসঅ্যান্ডআইআই শাখা থেকে উপ-পুলিশ কমিশনার সদরদপ্তর ও প্রশাসন এবং অর্থ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদুল ১৯৯৭ সালে কনস্টেবল পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন। ২০০০ সালে ডিএমপিতে বদলি হয় তার। এরপর ২০০১ সালের ১৫ মার্চ ডিএমপি সদরদপ্তরের অর্থ বিভাগে কনস্টেবল হিসেবে যোগদান করেন। আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৬ সালে এএসআই এবং ২০১১ সালে এসআই পদে পদোন্নতি পান শহীদুল। এই পুরো যাত্রাপথ ডিএমপি অর্থ বিভাগেই কেটেছে তার। ২০০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি ডিএমপিতে ২৭ বছর কর্মরত। যার মধ্যে ২৬ বছর ডিএমপির অর্থ বিভাগের এক চেয়ারেই কাজ করছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ডিএমপির বিভিন্ন কেনাকাটা, মেরামত ও উন্নয়নমূলক কাজের সব ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থবিলের একটি অংশ (কমিশন) নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শহীদুলের বিরুদ্ধে। কোনো ঠিকাদার যদি তার চাহিদামাফিক টাকা না দেয়, তাহলে তিনি বিলের চেক নিয়ে হয়রানি করেন। এমনকি শহীদুল ডিএমপির অর্থ বিভাগে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এখানে অন্য কোনো পুলিশ সদস্যকে বদলি হয়ে আসতে দেয় না তারা।

২০০০ সালে যোগদান এবং এরপর দুটি পদোন্নতি এ ছাড়া অর্থ বিভাগে ২৬ বছর দায়িত্বপালন বিষয়টি স্বীকার করে এসআই শহীদুল হক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজেটে কাজ করার কারণে স্যারেরা রাখেন। এ ছাড়া সিলেটের বদলি আদেশ কর্তৃপক্ষ স্থগিত করেছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, এসব নিয়ে নিউজ করলে তার ঝামলা হয়ে যাবে। কোনো ভাবেই বাদ দেওয়া যায় কী না অনুরোধ করেন। তবে অর্থ হাতানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

এসআই শহীদুলের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত