যেখানে আইসিইউর অপেক্ষায় মরে যায় রোগী

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে সবসময় রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে। একই বিছানায় তিন-চারজন শিশুকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। বেড না পেলে অনেককে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হয়। এতে তাদের সেবা চরমভাবে ব্যাহত হয়। যেসব শিশুর অবস্থার অবনতি ঘটে, তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তরের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। পুরো হাসপাতালে শিশুদের জন্য মাত্র ১২টি আইসিইউ বেড রয়েছে। বছরের যেকোনো সময় চাহিদামতো আইসিইউ বেড পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আইসিইউ প্রয়োজন হলে সিরিয়াল দিতে হয়। প্রায় প্রতিটি রোগীকে অন্তত ২০-২৫ জনের পরে অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক শিশুর মৃত্যু হয়ে যায়।

আইসিইউর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, এই ওয়ার্ডে বেড পেতে হলে ভেতরের কোনো রোগীকে হয় সুস্থ হয়ে উঠতে হবে, নয়তো মারা যেতে হবে। তবেই বাইরের রোগী বেড পাবে। কারণ ১২টি বেডের বিপরীতে চাহিদা সবসময় কয়েকগুণ বেশি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজশাহী বিভাগের সব জেলা থেকে রোগীরা এখানে আসেন। দক্ষিণাঞ্চলের জটিল রোগীদেরও অনেক সময় রামেকে পাঠানো হয়। অন্যত্র আইসিইউ না থাকায় অভিভাবকরা জটিল অবস্থার শিশুদের এখানেই নিয়ে আসেন। রামেক হাসপাতালের ১০, ২৪, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে শিশুদের চিকিৎসা চলে। এসব ওয়ার্ডে বেডের সংখ্যা ২০০টি। কিন্তু সবসময় রোগী থাকে অন্তত এক হাজার। ওয়ার্ডগুলো সবসময় লোকে লোকারণ্য। পুরো ওয়ার্ডে স্যালাইন ঝুলতে দেখা যায়। একটি বেড ঘিরে তিনজনের পরিবার বসে থাকে। জটিল রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে, যাদের নিবিড় পরিচর্যা দরকার, তাদের পরিবারের সদস্যরা হয়ে পড়েন বিচলিত। চাইলেই আইসিইউতে রাখা যায় না। সিরিয়াল ধরে অপেক্ষা করতে হয়। সমাজের প্রভাবশালীরা প্রায়ই আইসিইউর জন্য সুপারিশ করেন। তবু চিকিৎসকদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে হয়, কারণ বেড খালি না থাকলে কোনোভাবেই রোগী রাখা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি লিখেছেন, একজন বাচ্চার মা কাঁদতে কাঁদতে মোবাইলে বলেছেন, ‘এত জায়গা থেকে তদবির করালাম, তবু আমার বাচ্চাকে আইসিইউ বেড দিলেন না। বেড পেলে বাচ্চাটি বেঁচে যেত। আমার বাচ্চাটা মারা গেল আর লাগবে না বেড। আপনারা কিছুই করলেন না।’ এটি একজন মায়ের কথা মাত্র। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র ডেডিকেটেড ১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে সেদিন সকালেও ৩৭ জন ভর্তির অপেক্ষায় ছিল।

ডা. কামাল বলেন, প্রায়ই এমন ফোনে অভিশাপ পেতে হয় তাকে। তিনি আরও জানান, কোভিডকালে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে অনেক যন্ত্রপাতি পাওয়া গিয়েছিল। ২০২২ সালে কোভিড শেষ হওয়ার পর তৎকালীন পরিচালকের অনুমতি নিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে ৪ শয্যার একটি ডেডিকেটেড শিশু আইসিইউ চালু করেন। থাইল্যান্ডের শিশু হাসপাতালে মাত্র তিন সপ্তাহের ট্রেনিং ছিল তার। নার্সদেরও শিশু আইসিইউতে অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু আল্লাহর ওপর ভরসা করে শুরু করেছিলেন।

সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ১০ শয্যার শিশু আইসিইউর অবকাঠামো তৈরি করলেও জনবল ও যন্ত্রপাতি এখনো বরাদ্দ হয়নি। ২০২৪ সালে তৎকালীন পরিচালকের অনুমতি নিয়ে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বেড না পেয়ে অ্যাডাল্ট আইসিইউ বেড দিয়েই চার শয্যার জায়গায় ১২ শয্যার শিশু আইসিইউ চালু করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগ থেকে ধার করা চিকিৎসক দিয়ে এটি চলছে। শিশু বিভাগের একজন কনসালট্যান্ট সকালে রাউন্ড দিয়ে যান।

ডা. কামাল প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের এই ছোট্ট বাচ্চাদের জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের প্রতিটি জেলায় সরকারিভাবে শিশু আইসিইউ তৈরি করতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? অবকাঠামো তৈরি হয়ে পড়ে থাকা শিশু আইসিইউ কমপ্লেক্স অথবা ২০০ কোটি টাকা খরচে নির্মিত রাজশাহীর একমাত্র ডেডিকেটেড শিশু হাসপাতাল চালু করতে কি এত সময় লাগা উচিত? বর্তমান সরকারের কাছে ঢাকার মতো রাজশাহীর দিকেও সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

তার মতে, সরকারের বিদ্যমান সম্পদের সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনাতেই এটি সম্ভব।

এদিকে, আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সাধারণ মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। সরকারি আইসিইউতে চিকিৎসা খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা অনেক বেশি, যা নিম্নবিত্ত তো দূরের কথা, মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে।

রাজশাহীর বনগ্রাম এলাকার বেলাল উদ্দিন জানান, তার বোনের ছেলে নিউমোনিয়ায় অসুস্থ হয়ে রামেকে ভর্তি হয়। দুদিন পর জানানো হয় অবস্থা ক্রিটিক্যাল, আইসিইউতে নিতে হবে। সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে করতে কোনো আশা দেখা যায়নি। শেষে বেসরকারি রয়্যাল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিদিন খরচ ৮-৯ হাজার টাকা। পরিবারের পক্ষে তা বহন করা কষ্টকর ছিল। ৮-৯ দিন পরও বাচ্চাটিকে বাঁচানো যায়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেকে ৪০ শয্যার আইসিইউ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৮টি ও শিশুদের জন্য ১২টি। এটি হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে চলছে। সরকারি বরাদ্দ না থাকায় স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।

সম্প্রতি নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। জটিল অবস্থায় তাদের বেশির ভাগেরই আইসিইউ প্রয়োজন হয়। চিকিৎসকদের মতে, এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা দরকার হয়।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ১২টি বেডের বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার থেকে ১২০০ শিশু ভর্তি হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকে তিন থেকে সাড়ে ৩ হাজার রোগী। এর মধ্যে প্রতিদিন আনুমানিক ৫০ জন মারা যায়। শিশু বিভাগে প্রতি সপ্তাহে ৩৫-৪০ জন শিশুর মৃত্যু হয়। আইসিইউ বেড চাহিদার তুলনায় অনেক কম এটা সত্য। সবসময় সিরিয়াল থাকে। ৪০টি আইসিইউ বেডের মধ্যে শিশুদের ১২টি। চাহিদা কয়েকগুণ বেশি।

তিনি জানান, রাজশাহীতে শিশু হাসপাতালের ভবন তৈরি হয়ে গেছে। সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হলে শিশুদের সেবার মান বাড়বে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করে আসছি। বেডসংখ্যা বাড়ানো এবং বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছি। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসেন; কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যান। আইসিইউ বেড বাড়ানোর দাবি বারবার করা হলেও তা পূরণ হয়নি। শিশু হাসপাতালের ভবন তৈরি হয়ে পড়ে আছে অথচ কার্যক্রম শুরু হয়নি। আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি রাজশাহী শিশু হাসপাতাল অবিলম্বে চালু করা হোক।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত