আর বলবে না মা তুমি ঈদে কি কাপড় নিবা

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

‘এবার ঈদে মেয়েটা ছোট দুই ভাইয়ের জন্য শার্ট-প্যান্ট আনছে। বাপের জন্য পাঞ্জাবি। হামার জন্য শাড়ি। মেয়েটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিমু। প্রতি মাসে নিজের জন্য কিছু টাকা জমা রাখত। আর কিছু আমাদের দিত। ঈদ আসলে তাকিয়ে থাকতাম। মেয়েটা আসবে। এখন আর কেউ বলবে না ‘মা তুমি ঈদে কী কাপড় নিবা। তোমার জন্য নতুন কাপড় নিয়ে আসব।’ গতকাল শনিবার সকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের রিপা আক্তারের মা বিলকিস বেগম।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী কৃষক। অভাবের সংসার। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেনি। মেয়েটা কেবল উপার্জন শুরু করল তাতেই মরে গেল। চারটা ভাতের জন্য বিদেশ গেল। সেই বিদেশে যাওয়ার সময় মেয়েটা জীবন দিয়ে দিল। আমাদের সুখে রাখতে সব শেষ হয়ে গেল।’

গতকাল নিহত রিপার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিলকিস বেগম বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। আত্মীয়স্বজনরা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত¡না দিচ্ছেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিপার বাবা আবদুর রশিদ বলেন, ‘হামার মাইয়া (মেয়ে) কেলাস এইটে পড়ছিল। ট্যাকার অভাবে লেখাপড়া করার পারি নাই। কষ্ট করে ঢাকাত গিছিলো। চার বছর ধরে পোশাক কারখানায় চাকরি করছে। টাকা উপার্জন করছে। প্রত্যেক মাসে হামাক টাকা দিত। সে টাকা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলাতাম। আশা ছিল, কিছুদিন পর মেয়ের বিয়ে দেব। সব আশা মাটি হয়ে গেল।’ তিনি বলেন, ‘মেয়ে আমাকে বলে, বাবা আমি টাকার অভাবে লেখাপড়া করতে পারিনি। আমার ছোট দুই ভাইকে বড় করে মানুষের মতো মানুষ করব। লেখাপড়ার খরচের টাকা আমি দেব। তোমাক চিন্তা করার লাগবে না। সেই মেয়েটা আমার মরে গেল। হামার মেয়েটা কেন মরল। আমরা এর বিচার চাই।’

গত শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের মা ও ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হয়। গতকাল শনিবার সকাল ৮টায় পাঁচটি মরদেহ নিজপাড়া গ্রামে পৌঁছালে শুরু হয় শোকের মাতম। তাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি চলছিল। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে নিজপাড়া গ্রাম। গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম জুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে চলছে কান্না ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি। আশপাশের লোকজন নিহতদের স্বজনদের সান্ত¡না দিচ্ছেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, চার বছর ধরে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন রিপা। তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস করে চাকরিতে যোগ দেন। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই বিদ্যুৎ একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। ছোট দুই ভাই সবুজ (৮) ও ওমর (৬) বাবা-মার সঙ্গে থাকে।

গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে বাসটির তেল ফুরিয়ে যায়। তখন বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এ সময় বাসের কয়েকজন যাত্রী নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসেছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে রিপাসহ পাঁচজন নিহত হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত