রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন গুম, খুন, আয়নাঘরে নির্যাতন ও মুঠোফোনে আড়িপাতার বিষয়গুলো অস্বীকার করছেন। এসব ঘটনায় কোনো দায় নেই দাবি করে বলেছেন, এসব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা করেছেন। পাশাপাশি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নানা উন্নয়ন গুণগান এবং সেসব উন্নয়নে তাদের অবদান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এ ছাড়া এক-এগারোর সরকার গঠন, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক দরকষাকষিসহ সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তারা। শুধুমাত্র আদেশ পালন করতে গিয়ে কিছু কাজের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন বলে জানান এই দুই কর্মকর্তা। গতকাল রবিবার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
তদন্ত সূত্র জানায়, মামুন খালেদের রিমান্ড বাকি আছে আরও দুদিন। আর মাসুদ উদ্দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর আরও ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলমান রয়েছে এবং তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাইও করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গুম, খুন ও তৈরি করা আয়নাঘরের দায় নিচ্ছেন না তারা। একই সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী সরকার নানা উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে গুণগান গেয়েছেন এবং এসব ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া অভিযোগের অনেক বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তার উত্তর পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা করেছেন তারা।
গতকাল দুপুরে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে একজন রিমান্ডে রয়েছেন। অন্যজনকে ফের রিমান্ডে আনার আবেদন করা হয়েছে। আদালত থেকে রিমান্ড পেলে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকবে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তারা অকপটে কোনো তথ্য দিচ্ছেন না। তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলছেন। তাদের দেওয়া কিছু কিছু তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দুদলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এর নেপথ্যে কোন কোন দেশের সবুজ সংকেত ছিল, গ্রেপ্তার অভিযান শুরুর আগে কখন কোথায় নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়, ওই বৈঠকে কারা ছিলেন এসব প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন মাত্র।
মাসুদের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল, গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রেপ্তারের আগে আপনি অনুমোদন দিতেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। এ প্রশ্নে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তবে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিত।
ওয়ান-ইলেভেনের সময়কালে জরুরি অবস্থা জারির পর দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল ওই টাস্কফোর্সের সমন্বয় করতেন আপনি। দুর্নীতি দমনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছেন আপনারা এসব অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৎপথে উপার্জন করে জীবন নির্বাহ করেছি।’
মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ : এদিকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৭ এপ্রিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে হাজির করার নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ মামুন খালেদ এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’। তাদের অতীতের বহু কর্মকা- মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।
মানব পাচারের মামলায় জেনারেল মাসুদ ফের রিমান্ডে : মানব পাচার ও ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। এর আগে তার পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল আবার ছয় দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম আবেদন মঞ্জুর করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের এসআই (উপপরিদর্শক) রায়হানুর রহমান রিমান্ডের এ আবেদন করেন। এর আগে গত মঙ্গলবার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে নেয় ডিবি পুলিশ।