পাশাপাশি দুটি রিকশা। তাতে চারটি মরদেহ। দেহগুলো ছিন্নভিন্ন। বুকে, পেটে, হাতে ও কোমরে ছোপ ছোপ রক্ত। নিহতদের হাতগুলো অসহায়ভাবে ছড়ানো। মুখে যন্ত্রণার করুণ ছাপ। বাংলাদেশের এই গণহত্যার ছবিটি ১৯৭১ সালে বিশ^বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ছবিটি একাত্তরের নির্মম হত্যাযজ্ঞের একটি আইকনিক আলোকচিত্র হিসেবে বাঙালি হৃদয়ে খোদাই হয়ে যায়। কিন্তু এই ছবিটি নিয়ে আছে নানা ভ্রান্তি। প্রতিবছর ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে বিভিন্ন গণমাধ্যম ছবিটিকে একাত্তরের কালরাতে সংঘটিত ঢাকার গণহত্যার দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। ক্যাপশনে জুড়ে দেওয়া হয় মনগড়া তথ্য। কখনো আলোকচিত্রীর নাম ব্যবহার করা হয়, আবার কখনো শুধু দায়সারাভাবে লিখে ‘সংগৃহীত ছবি’। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর অতিবাহিত হলেও এই ছবির প্রকৃত তথ্য মানুষের দুয়ারে গিয়ে পৌঁছাতে পারেনি।
তাহলে এই ছবির প্রকৃত ঘটনা কী? কবে, কোথায় তোলা হয়েছিল ছবিটি? কে তুলেছিলেন রক্ত হিম করা এমন ছবি? আর কেমন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ^জনমত গড়ে তুলেছিল ছবিটি? ঐতিহাসিক ছবিটির পটভূমি ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে বের হয়ে আসে আসল তথ্য। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছবিটি প্রথম ছাপা হয় ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল ভারতের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায়। তিন কলামে ছাপা হওয়া ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয় ‘সাইকেল রিকশা পুলারস অ্যান্ড দেয়ার প্যাসেঞ্জারর্স শুট ডেড বাই পাকিস্তানি ট্রুপস অন দ্য ওয়ে টু সৈয়দপুর, ইন দিনাজপুর ফটোগ্রাফ বাই অমিয় তরফদার।’ ছবিটি ছাপা হওয়ার পর দুনিয়া জুড়ে হইচই শুরু হয়ে যায়। এরপর ২৬ এপ্রিল বিশ^বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ৩৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ছবিটি ছাপা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয় ‘ইস্ট পাকিস্তান বোম্বিং ভিকটিমস ইন পিডিক্যাবস। এ কোশ্চেন অব হিউম্যান আর্থমেটিক।’ পরবর্তী সময়ে আসামের যুগশক্তিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রভাবশালী পত্রিকায় ছবিটি বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। দ্য স্টেটসম্যান-এর ক্যাপশনে ঘটনাস্থল হিসেবে দিনাজপুরের সৈয়দপুরের কথা বলা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দিনাজপুরের কোথাও সৈয়দপুর নামে কোনো জায়গা নেই। প্রকৃতপক্ষে সৈয়দপুর হলো নীলফামারীর একটি উপজেলা, যার অবস্থান দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পুবে।
ছবিটির প্রকৃত তথ্য জানতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে দিনাজপুরের বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সবার দাবি, ঘটনাটা ঢাকার না, দিনাজপুর শহরে অবস্থিত ঘাসিপাড়া বিহারি পল্লীর। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ঘাসিপাড়ায় স্থানীয় বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে। ছবিটি সেই ঘটনার। এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বণিক বার্তার দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি আসাদুল্লাহ্ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আসাদুল্লাহ্ একসময় প্রথম আলোর দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। তাকে ঘাসিপাড়ায় গিয়ে ঘটনাটি অনুসন্ধানের অনুরোধ জানাই। সরেজমিনে গিয়ে তিনি দুজন প্রত্যক্ষদর্শীকে খুঁজে বের করেন। তাদের একজন মো. সেলিম খান, আরেকজন আবদুস সাত্তার।
সেলিম খান ও আবদুস সাত্তারের বয়ানে জানা যায়, দিনাজপুর শহরের বিহারি অধ্যুষিত একটি মহল্লা ঘাসিপাড়া। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে ঘাসিপাড়ার কিছু অবাঙালি সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তারা বাঙালিদের বাড়িঘরে হামলা চালায় ও হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটায়। এ ঘটনায় স্থানীয় বিহারি ও বাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা বেধে যায়। নিরীহ বাঙালির ওপর বিহারিদের এমন নৃশংস হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এপ্রিলের ৮ অথবা ৯ তারিখে ২৫-৩০ জন বিহারি হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। অমিয় তরফদারের তোলা ছবিটি ঘাসিপাড়ার পাশে গণেশতলা সড়কে তোলা।
৯৭ বছর বয়সী সেলিম খান মুক্তিযুদ্ধের সময় দিনাজপুর শহরের রুস্তম ফটো স্টুডিওতে কাজ করতেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে তিনি স্থানীয় দৈনিক উত্তরায় ফটোসাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। সেলিম খান বলেন, ‘একটি রিকশায় মাথায় ঝাঁকড়া চুল ও দাড়িসমেত যে মানুষটিকে দেখা যায়, তার নাম মমতাজ উদ্দিন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে মমতাজ উদ্দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের পর তার মনোবৈকল্য দেখা দেয়। ’৬৬-৬৭ সালের দিকে তিনি ঘাসিপাড়ায় আসেন। সেই থেকে তিনি বিহারি পল্লীতেই থাকতেন। কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না। সারাদিন রাস্তার ধারে দোকানগুলোর সামনে বসে থাকতেন। স্থানীয়রা তাকে “মস্তান” নামে ডাকত। মমতাজের লাশের নিচে যে আরেকটি লাশ, তার পরিচয় আজও উদ্ধার করা যায়নি। অন্য রিকশায় যে দুজন যুবকের লাশ দেখা যায়, তার একজনের নাম নিজামউদ্দিন। নিজামউদ্দিনের লাশটি নিচের দিকে ঝুলে আছে। শহরের গণেশতলায় “ওসমানিয়া হোটেল” নামে নিজামউদ্দিনের বাবার একটি দোকান ছিল। এই হোটেলেই তিনি বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। তার বাড়ি দিনাজপুর শহরের মিশন রোডে।’
ঘটনার পর সেলিম খান এলাকার দু-তিনজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে ঘাসিপাড়া বিহারি পল্লী থেকে মমতাজ উদ্দিন ও অপরিচিত একজনের লাশ উদ্ধার করেন। তারা দুজনের লাশ রিকশায় করে দিনাজপুর হাসপাতালের দিকে রওনা হন। দেড়শ গজ সামনে যেতেই শহরের গণেশতলায় আরেকটি রিকশায় তারা নিজামউদ্দিন ও অপরিচিত আরেকজনের লাশ দেখতে পান। এ সময় পাকিস্তানি আর্মিদের বোমা বর্ষণ শুরু হয়। একটি শেল এসে তাদের সামনে পড়ে। তখন লাশ রেখেই তারা পালিয়ে যান। পরে সেলিম খান শুনেছেন লাশগুলো পুনর্ভবা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি যে ফটো স্টুডিওতে কাজ করতেন, তার মালিক রুস্তম আলীর ছোট ভাই মো. আবুল হাশিম ও মো. আবুল কাশিমও সেদিন হত্যাকা-ের শিকার হন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আবদুস সাত্তার তখন দিনাজপুর সরকারি কলেজে বিএ ক্লাসে পড়তেন। তার চোখের সামনেই বাবা আবদুল আজিজ ও স্কুলপড়–য়া দুই ভাই আবদুর রহমান এবং আবদুস শফিককে হত্যা করা হয়। তাদের বাড়ির পাশের মসজিদের সামনে গর্ত করে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। আবদুস সাত্তার বলেন, ‘গণমাধ্যমে দুটি রিকশায় যে চারজনের মৃতদেহ দেখা যায়, তারা বাঙালির নন, বিহারি।’
বাংলাদেশের গণহত্যার এই আইকনিক ছবিটি নিয়ে আলোকচিত্রী অমিয় তরফদারের একটি স্মৃতিচারণা পাওয়া যায়। ‘ভুলি নাই ভুলি নাই’ শিরোনামের স্মৃতিচারণাটি ছাপা হয় ১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর সাপ্তাহিক ২০০০-এ। ওই বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে অমিয় তরফদারের প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ৭৮টি ছবি দিয়ে ‘অমিয় তরফদারের ক্যামেরায় ১৯৭১’ শিরোনামের মাসব্যাপী ওই প্রদর্শনীর আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘরের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় এসে ওই স্মৃতিচারণা করেন। বাংলাদেশের নওগাঁয় জন্ম নেওয়া অমিয় তরফদার ছিলেন ভারতের একজন বিখ্যাত স্পোর্টস ফটোগ্রাফার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধই তাকে ওয়্যার ফটোগ্রাফার হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অমিয় তরফদার অলিম্পিক গেমস কাভার করতে জাপানে অবস্থান করছিলেন। সেখানকার পত্রিকায় বাংলাদেশের নির্মমতার খবর পড়ে তিনি ছুটে আসেন কলকাতায়। এরপর হিলি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ৮ এপ্রিল বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
হিলি সীমান্তে অমিয় তরফদারের সঙ্গে কয়েকজন মুক্তিসংগ্রামীর পরিচয় হয়। তারা একটি জিপে করে তাকে দিনাজপুরে নিয়ে আসেন। দিনাজপুর শহরে ঢুকতেই বিকেল। গ্রামের একটি রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য লাশ। কারও মাথা নেই, কারও পা নেই। কারও পা, মাথা, হাত ও চোখ ছিন্নবিচ্ছিন্ন। রাস্তার পাশের খালে কচুরিপানার নিচে অনেক মানুষ। কেউ মৃত, কেউ অর্ধমৃত। অশ্রুভেজা চোখে তিনি এই দৃশ্যের অনেক ছবি তুললেন। এলাকায় তখনো আতঙ্ক। শত্রুরা যেকোনো সময় চলে আসতে পারে।
তখন প্রায় সন্ধ্যা। মুক্তিসংগ্রামীরা তাকে দিনাজপুর শহরে এক মাড়োয়ারির বাড়িতে নিয়ে যান। তার নাম সগনলাল লহিয়া। সবাই তাকে এসডি লহিয়া নামে ডাকতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আরও ছবি তুলতে চান শুনে এসডি লহিয়া দুজন মুক্তিসংগ্রামীকে অমিয় তরফদারের সঙ্গে দিলেন। গ্রামগুলোতে তখনো আগুন জ¦লছে। পুরো এলাকা রক্তে ভেজা। সঙ্গে ফ্ল্যাশ না থাকায় অন্ধকারে ছবি তোলা সম্ভব হলো না। রাতে লহিয়ার বাড়িতে ফিরে এলে তাকে মই দিয়ে একটি টিনের ঘরে পাটাতনের ওপর তুলে দেওয়া হলো। টিনের চালের নিচের পাটাতনে অসংখ্য নারী-শিশু-বৃদ্ধ নিঃশব্দে শুয়ে আছে। এই বাড়িতে যে ভারতীয় সাংবাদিক আছেন, তা এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। রাত ২টার দিকে পাটাতন থেকে নিচে নেমে এসে অমিয় তরফদার বললেন, ‘আমার জন্য এত চিন্তা করার দরকার নেই। এ দেশের জন্য আমার শহীদ হতেও আপত্তি নেই।’
সকালে দুই মুক্তিসংগ্রামীকে সঙ্গে নিয়ে অমিয় তরফদার বের হলেন ছবি তুলতে। এ সময় তিনি দেখতে পেলেন রাস্তায় দুটি রিকশার ওপর লাশের স্তূপ। এই ছবি তুলে তিনি গেলেন রাধিকাপুর সীমান্তে। সেখানে তিন দিন কাটিয়ে ফিরে গেলেন কলকাতায়।
