আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলাসহ সব ধরনের মামলা হয়েছে। বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন-পর্যায়ের নেতাদের আসামি করা হয় ওইসব মামলায়। কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে দুই শতাধিকেরও বেশি মামলা আছে। সেসব মামলায় কারাবরণও করেছেন অনেকে। কোনো কোনো নেতা গুমও হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মামলার গ্লানি টানতে টানতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। ৫ আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর আলোচনায় আসে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি। অন্তর্বর্তী সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিলেও সব শেষ করতে পারেনি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনার প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে, তবে ভুক্তভোগীকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে এজাহার ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চার্জশিটের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে। চার্জশিটের কপি পর্যালোচনা করে কমিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। আবেদন পাওয়ার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসক পিপির (পাবলিক প্রসিকিউটর) কাছে মতামতের জন্য পাঠাবেন। পিপি ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ডিসির কাছে মতামত দেবেন। পরে বিষয়টি জেলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করতে হবে। সব মিলিয়ে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ ফাইল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ২৪ হাজারের মতো রাজনৈতিক মামলা আছে। মামলাগুলো যাচাই বাছাই করে প্রত্যাহার করা হবে। তবে বিএনপির কোনো নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা থাকলে (যদি উদ্দেশ্যমূলক না হয়) সেগুলো প্রত্যাহার হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানালে পড়ে হওয়া মামলা বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে গঠন হওয়া কমিটিকে বেশকিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা ‘হয়রানিমূলক মামলা’ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক রূপরেখা তৈরি করেছে বর্তমান সরকার। এখন থেকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতেই নয়, বরং তদন্তপরবর্তী ‘চার্জশিট’ বা অভিযোগপত্র দাখিলের পর্যায়েই এসব মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, দ্রুততার সঙ্গে এসব মামলার তালিকা প্রস্তুত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা হবে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তথ্য উপস্থাপন করতে হবে এবং ৪৫ দিনের মধ্যে প্রতিটি মামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
হয়রানিমূলক মামলার দীর্ঘ ছায়া : গত দেড় দশকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে মামলার ব্যবহার একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। একে বলা হতো ‘মামলা-বাণিজ্য’ বা ‘গায়েবি মামলা’। বিশেষ করে ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে দেশ জুড়ে কয়েক হাজার মামলা হয়। এসব মামলায় সুনির্দিষ্ট আসামির পাশাপাশি শত শত ‘অজ্ঞাতনামা’ ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এসব মামলার বড় একটি অংশই ছিল ভিত্তিহীন। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী কিংবা হাসপাতালের শয্যায় শায়িত মুমূর্ষু রোগীকেও ককটেল বিস্ফোরণ বা নাশকতার মামলায় আসামি করা হয়েছে। এই হয়রানি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই সরকার বিশেষ সেল গঠন করেছে।
কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসক : দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযোগ নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিযোগ নতুন মাত্রা পায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জানুয়ারি২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ দায়ের হওয়া ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা’ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াকে প্রশাসনিক কাঠামোয় আনা হয়েছে। মামলাগুলো জেলাপর্যায়ের বিশেষ কমিটি যাচাই করে প্রত্যাহারের সুপারিশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রধান হবেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। সদস্য থাকবেন পুলিশ সুপার (মহানগরে ডেপুটি কমিশনার), পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এবং সদস্য-সচিব হিসেবে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। প্রশাসন ও বিচারসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই চার কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত কমিটি মামলার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে।
নথি পাওয়া দুস্কর : অনেক ভুক্তভোগীর পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে পুরনো মামলার ক্ষেত্রে নথি পাওয়া, আদালতের দৌড়ঝাঁপ এবং প্রশাসনিক জটিলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। খুলনার একজন ভুক্তভোগী বলেন, তার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের দুটি মামলা রয়েছে। এখন সেই মামলার কাগজপত্র জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। যদি প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করা না হয় তাহলে অনেকেই এই সুযোগ নিতে পারবেন না। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ ও ২০০৬ সময়কালে দায়ের হওয়া বিএনপি আমলের রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তখনো জেলাপর্যায়ে কমিটি গঠন করে মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়। হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী মুক্তি পান। তবে সেই সময়ের প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। ওই সময়ে অভিযোগ উঠেছিল, হত্যা, সন্ত্রাস বা দুর্নীতির মতো মামলাও ‘রাজনৈতিক’ আখ্যায় প্রত্যাহার করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে আইনি মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। মামলা প্রত্যাহারের নামে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
এক সপ্তাহের মধ্যে তথ্য উপস্থাপন : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং পুলিশ সুপারদের (এসপি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাদের নিজ নিজ এলাকার রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলার তালিকা আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। তালিকায় মামলার নম্বর, ধারা, আসামির সংখ্যা এবং মামলার বর্তমান অবস্থা উল্লেখ থাকতে হবে। তালিকা পাওয়ার পর একটি উচ্চ পর্যায়ের স্ক্রিনিং কমিটি প্রতিটি মামলা পর্যালোচনা করবে। কোনো মামলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রমাণ এবং অভিযোগের তথ্য-প্রমাণের অভাব থাকে, তবে ৪৫ দিনের মধ্যে সেই মামলা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হবে।
গুরুতর মামলার দিকে বিশেষ নজর : হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকলেও ‘গুরুতর’ প্রকৃতির অপরাধের ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো নৃশংস অপরাধের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত, তাদের মামলাগুলো হয়রানিমূলক মামলার কাতারে ফেলা হবে না। যেসব মামলায় ভিডিও ফুটেজ বা ফরেনসিক প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহারের তালিকায় স্থান পাবে না। সরকার নিশ্চিত করতে চায়, রাজনৈতিক হয়রানি থেকে মুক্তির নামে যেন প্রকৃত অপরাধীরা পার না পেয়ে যায়। এ জন্য প্রতিটি মামলার ডকেট বা নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
২৩৮৬৫টি মামলার সুপারিশ আগের সরকারের : স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৪ হাজার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল বিদায়ী অন্তর্র্বর্তী সরকার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত হওয়া এসব মামলা পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলায় কমিটি গঠন করা হয়। একইসঙ্গে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিও করা হয়। পরে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন চাওয়া হয়। দলগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি ৩৯টি সভায় বসে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে। সভায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলাকে হয়রানিমূলক মামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সব মামলায় প্রায় পাঁচ লাখ নেতা-কর্মী হয়রানির শিকার হয় বলে সভায় জানানো হয়। এখন নতুন সরকার নতুন করে আরেকটি কমিটি গঠন করে দ্রুত সময়ে বিষয়টি সমাধান করতে চাচ্ছে।
সতর্ক না হলে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলার অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সেগুলো প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক হতে হবে। গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার হয়, তাহলে এটি আইনের শাসনের পরিপন্থি হবে। আবার প্রকৃত হয়রানির শিকার কেউ যদি ন্যায়বিচার না পান, সেটিও সমানভাবে অন্যায়। তিনি বলেন, জেলাপর্যায়ের কমিটি ভালো উদ্যোগ হলেও এতে প্রশাসনের প্রভাব বেশি। এখানে বিচার বিভাগের সরাসরি কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমা, নথিপত্র যাচাই এবং পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহার না হয়। এটি কোনো ঢালাও সিদ্ধান্ত হবে না। প্রতিটি মামলা আলাদাভাবে যাচাই করা হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রমাণিত না হলে কোনো সুপারিশ করা হবে না। তবে বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ অনেক সময় প্রভাব ফেলতে পারেএটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারপরও আমাদের চেষ্টার কমতি থাকবে না।