রায়ের তারিখই ২৭ বার!

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৫ এএম

অধস্তন আদালতে ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আসে রায়ের পর্যায়। ক্ষেত্র বিশেষে রায় প্রস্তুত না হলে অথবা বিচারক অসুস্থ হলে নতুন তারিখ পড়ে। এ ছাড়া বিচারক বদলি হলে নতুন বিচারক পুনঃশুনানি নিয়ে রায়ের তারিখ ধার্য করেন। এই প্রক্রিয়াও এক, দুই বা তিনবারের বেশি দেখা যায় না। কিন্তু অনুসন্ধানে ঢাকার একটি আদালতে চেক প্রত্যাখ্যানের এমন একটি মামলা পাওয়া গেছে, যেখানে সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৮ বছরের বেশি সময়ে রায়ের জন্য ২৭টি তারিখ ধার্য হলেও কাক্সিক্ষত রায় হয়নি। শুধু তাই নয়, মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের শুনানি হয়েছে ৯ বছরে ২১টি ধার্য তারিখে। মামলাটি চলছে ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ প্রথম আদালতে। ১৩ বছর আগে দায়ের হওয়া এ মামলায় ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪৮ বার যুক্তিতর্কের শুনানি ও রায়ের তারিখ ধার্য হলেও বিচার এখনো অনিষ্পন্ন। এই আদালতে গত ৮ বছরে অন্তত আটজন বিচারক বিচারকাজে ছিলেন। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত বিচারক ছিলেন অন্তত চারজন। আগামী ৭ এপ্রিল ২৭তম বারের মতো মামলটির রায়ের জন্য দিন ধার্য আছে।

এমন ঘটনাকে দুর্লভ, অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর বলছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সিনিয়র জেলা এবং দায়রা জজ ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা। তারা অভিন্ন সুরে বলেন, সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে, সাক্ষ্যগ্রহণ বা শুনানিতে দিনের পর দিন তারিখ পড়ে। রায় দিতে দুই-তিনবারের বেশি তারিখ পড়ে না। কী কারণে ২৭ বার রায়ের তারিখ পড়ল, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা রহস্যজনক কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ বা সুপ্রিম কোর্টের খতিয়ে দেখা উচিত।

পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনার বা প্রত্যাখ্যাত হলে চেকদাতাকে আসামি করে (প্রথমে টাকা পরিশোধে নোটিস পাঠাতে হয়) যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (মহানগর পর্যায়ে মহানগর যুগ্ম জেলা ও দায়রা আদালত) আদালতে চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা করতে পারেন চেক গ্রহীতা। এই মামলা হয় হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ (নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট বা এন. আই. অ্যাক্ট) এর ১৩৮ ধারায়। দোষী সাব্যস্ত হলে চেকদাতাকে এক বছর কারাদন্ড ও চেকের তিনগুণ পরিমাণ টাকা জরিমানার রায় দিতে পারেন বিচারক। তবে, রায়ের পর চেকে উল্লেখিত টাকার ৫০ শতাংশ পরিশোধে আপিল করে জামিন নেওয়া যায়। অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতেও আবেদন করা যায়। চেক প্রত্যাখ্যানের মামলা জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য করা হয়েছে ফৌজদারি আইনে।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য (গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) অনুযায়ী, ৬৪ জেলার অধস্তন আদালতগুলোতে এন. আই. অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অধীনে ৩ লাখ ৭০ হাজার ২০৭ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ২৪ হাজার ৪৫৫ মামলা। ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতগুলোতে এ আইনে বিচারাধীন ১ লাখ ২০ হাজার ৩৫৮ মামলার মধ্যে ৫ বছরের বেশি পুরনো ১৩ হাজার ১৩৫ মামলা রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত মামলার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা এমএইচ মওদুদ হোসেন তার ব্যবসায়িক অংশীদার জাহাজ ব্যবসায়ী মো. সাখাওয়াত হোসেনকে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন ব্যাংকের অনুকূলে (দিলকুশা, মতিঝিল শাখা) ৩ কোটি টাকার একটি চেক দেন। দুজনেই ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা। তবে, মওদুদ হোসেনের ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় একই বছরের ২২ অক্টোবর চেকটি ডিজঅনার বা প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর টাকা ফেরত চেয়ে সাখাওয়াত হোসেন আইনজীবীর মাধ্যমে মওদুদ হোসেনকে একই বছরের ১১ নভেম্বর উকিল নোটিশ দেন। নোটিশের জবাব বা টাকা না দেওয়ায় ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি মওদুদ হোসেনকে আসামি করে ঢাকার একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এন. আই. অ্যাক্ট-এর ১৩৮ ধারায় চেক প্রতারণার মামলা করেন সাখাওয়াত হোসেন। একই দিন আসামি মওদুদ হোসেনের উদ্দেশ্যে সমন জারি করে আদালত। পরে সমনের জবাব দিয়ে জামিন নেন মওদুদ হোসেন।

২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ প্রথম আদালত মওদুদ হোসেনকে আসামি করে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। বাদী সাখাওয়াত হোসেনের সাক্ষ্য নেওয়া হয় একই বছরের ১৪ আগস্ট। ২০১৬ সালের ৩১ মে আসামিপক্ষে দুজনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। উভয়পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ওই বছরের ২২ নভেম্বর সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে প্রথমবার রায়ের তারিখ ধার্য হয় ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর। ওই দিন রায় না হয়ে তারিখ পেছানো হয়। এরপর রায়ের ধার্য দিনে তারিখ পিছিয়েছে। মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮ বছরের বেশি সময়ে ২১টি তারিখে যুক্তিতর্কের শুনানি হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর প্রথম রায়ের তারিখ থেকে এখন পর্যন্ত ৮ বছরের বেশি সময়ে ২৭টি রায়ের তারিখ ধার্য হয়েছে।

নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর প্রথম রায়ের তারিখ ধার্যের পর ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ, ৮ মে ও ১০ জুন তিনটি ধার্য তারিখে রায় হয়নি। ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ধার্য তারিখেও রায় প্রচার হয়নি। ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি, ৩ মার্চ, ৫ আগস্ট, ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮ অক্টোবর ও ২৩ নভেম্বর ছয়টি ধার্য তারিখেও রায় হয়নি। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ও ১২ আগস্ট, ২০২২ সালের ৬ মার্চ ও ১৩ নভেম্বর, ২০২৩ সালের ২২ মে, ১৬ আগস্ট, ৩১ আগস্ট, ১৯ অক্টোবর ধার্য তারিখে রায় দেয়নি সংশ্লিষ্ট আদালত। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ, ২৬ জুন, ২৮ জুলাই, ২৫ আগস্ট, ২৯ সেপ্টেম্বর এবং একই বছরের ২৭ নভেম্বর রায়ের জন্য নির্ধারিত দিন থাকলেও তা হয়নি। এরপর চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য এলে ওই দিনও রায় ঘোষণা না করে আগামী ৭ এপ্রিল পরবর্তী দিন ধার্য করে আদালত।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি বৃহত্তর জেলায় কর্মরত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (পেশাগত বিধির কারণে নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না) দেশ রূপান্তরকে জানান, এটি অস্বাভাবিক ঘটনা এবং তিনি তার বিচারিক জীবনে এই প্রথম এমন শুনলেন। ওই বিচারক বলেন, ‘বিশেষ কারণে রায় পেছাতে পারে। নতুন বিচারক দায়িত্ব নিলে অধিকতর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি হতে পারে। সেক্ষেত্রে রায়ের তারিখ দুয়েকবার পেছাতে পারে। অস্বাভাবিক কোনো বিষয় ছাড়া এমন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, এত বেশি রায়ের তারিখ নির্ধারণ নীতিগতভাবে অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য একটি ব্যাপার। তিনি বলেন, যদি পাঁচজন বিচারকও এই মামলা শুনে থাকেন এবং তাও খুব বেশি হলে ১০ বার হতে পারে। শাহজাহান সাজু বলেন, এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, অজ্ঞাত কোনো কারণ আছে কি না, তা বিচারিক কর্তৃপক্ষ বা সুপ্রিম কোর্টের দেখা উচিত।  

সংশ্লিষ্ট মামলার বিচার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে মামলাটি বদলি করতে গত বছরের ১০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতে সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে আবেদন করেন আইনজীবী মো. লুৎফর রহমান। আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, ‘মামলাটি এবং দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চলমান, এই সময়ে মামলাটি ২১টি তারিখ যুক্তিতর্কের জন্য এবং ২৫টি তারিখ (তখন পর্যন্ত) রায় প্রচারের জন্য থাকার পরও অজানা কারণে আদালত রায় প্রচার না করে ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে বাদী/অভিযোগকারীর দারুণ সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।’

অ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুনানি শেষে আদালত রায় দিতে সংশ্লিষ্ট অধস্তন আদালতকে আদেশ দিলেও তা প্রতিপালিত হয়নি। মামলার রায় বাদীর অনুকূলে আসার মতো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। রায়ের তারিখে আদালতে যাই, রায় পিছিয়ে যায়। কিন্তু কেনো পেছানো হয়, তার কারণ উল্লেখ করা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘রায় যাই হোক এভাবে তো ন্যায়বিচার হচ্ছে না।’

এ মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আলতাব হোসেন তালুকদার বাদী সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে চেক চুরি ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই কয়েক বছরে মামলাটিতে অনেক কিছু হয়েছে। একাধিকবার সাফাই সাক্ষ্য, অনেকবার যুক্তিতর্কের শুনানি ও রায়ের তারিখ হয়েছে। এই আইনজীবী বলেন, ‘আমরাও তো রায় চাই। কিন্তু কেন হচ্ছে না, সেটা বলতে পারব না।’ উভয়পক্ষের আইনজীবীরা জানান, একই বাদী ও বিবাদীদের মধ্যে প্রায় একই সময়ে ৮০ লাখ টাকার আরেকটি চেকের মামলাতেও বেশ কয়েকবার রায়ের তারিখ পড়লেও রায় হয়নি। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত অতিরিক্ত পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) রেহানা পারভীন গতকাল মুঠোফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে মামলাটি সম্পর্কে আমি অবগত নই। নথি না দেখে কিছু বলতে পারব না।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আমাদের প্রচলিত যে আইন, বিচারককে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার কোনোটার মধ্যে এটা পড়ে না। এটি উদ্দেশ্যমূলক এবং অস্বাভাবিক ঘটনা। বিচারকরা রায় থেকে আবার শুনানিতে দুয়েকবার যেতে পারেন, আইনে তাদের সে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটাও খুব দুর্লভ।’ তিনি বলেন, ‘বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে বাইরে থেকে কেউ কলকাঠি নাড়ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত