এপ্রিলের জন্য ৯ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে সরকার, যা দিয়ে এ মাসের গ্যাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে। এর মধ্যে খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে কেনা হচ্ছে ৮ কার্গো এলএনজি। আগামী মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ফলে আপাতত এলএনজি নিয়ে কোনো সংকট দেখছেন না কর্মকর্তারা।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যয় বাড়লেও সরকার এখন নানান উপায়ে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। সেজন্য বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি গুনতে হবে সরকারকে। তবে যুদ্ধ বিলম্বিত হলে কতদিন এ আর্থিক চাপ সহ্য করা যাবে, তা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এপ্রিল মাসের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এলএনজি ‘বুক’ করা হয়েছে। আশা করছি, এ মাসে এলএনজি সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। পাশাপাশি মে মাসের এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি আমদানিতে কোনো সংকট দেখছি না এখন পর্যন্ত। কিন্তু বিকল্প উপায় ও উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় হচ্ছে।
এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সূত্রমতে, এপ্রিলের জন্য যে ৯টি কার্গো কেনা হবে, তা আনা হবে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নাইজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে সব ধরনের এলএনজি আমদানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি একটি এলএনজি কার্গো কেনা হচ্ছে কাতার এনার্জির কাছ থেকে। কার্গোটি সরবরাহ করবে অ্যাঙ্গোলা থেকে। বাকি আটটি কার্গো কেনা হবে খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে।
ইরান যুদ্ধের পর থেকে সরবরাহ সংকটে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি কমপ্লেক্সসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদন কেন্দ্র ও রপ্তানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে এখন প্রতি মিলিয়ন ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি আমদানিতে প্রায় ২০ ডলার গুনতে হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এলএনজি কার্গোর গড় দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ১০-১১ ডলার।
আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ১২টি এলএনজি কার্গো কেনার দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। এপ্রিলের জন্য স্পট মার্কেট থেকে কেনা প্রতি কার্গো এলএনজির পেছনে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯৫০ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৩৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে।
এদিকে মে মাসের জন্য ১১ কার্গো এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেজন্য গত ১ এপ্রিল দরপত্র আহ্বান করেছে আরপিজিসিএল। আগামীকাল শনিবার দরপত্র খোলার কথা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ কোটি ঘনফুট। যদিও সরকারি হিসেবে এ চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে এখন প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসই আমদানিকৃত।
চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও সার সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেলের ২৫-৩০ শতাংশ এবং এলএনজির ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই যাতায়াত করে।
ভর্তুকির চাপ বাড়ছে : সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এলএনজি আমদানিতে এবং বাকি সাত হাজার কোটি টাকা যাবে জ্বালানি আমদানিতে, যা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রয়কৃত ডিজেলের বাড়তি খরচ মেটাতে ব্যয় হবে।
আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এলএনজি ভর্তুকির জন্য ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। অতিরিক্ত ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ফলে এখন শুধু এলএনজি খাতেই মোট ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্পট মার্কেটে এলএনজির আকাশচুম্বী দাম এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ বিঘিœত হওয়াই এ ভর্তুকি বাড়ার প্রধান কারণ। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নৌপরিবহন সংকটের কারণে বেশ কিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি ‘ফোর্স মেজার’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এখন ধারণা করছে, এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ আসবে স্পট মার্কেট থেকে, যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলা ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল, যার মধ্যে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীনে ১০৩টি এবং স্পট মার্কেট থেকে ১২টি কার্গো আসার কথা ছিল।
দেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি কেনে বাংলাদেশ। এর মধ্যে কাতার এনার্জির কাছ থেকে প্রতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি কেনা হয়। আর ওমানের ওকিউটি থেকে কেনা হয় ১৬ কার্গো এলএনজি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ এখন ব্যয়বহুল স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
