দুদক, বিচার বিভাগসহ তিনটি অধ্যাদেশ বিল আকারে চায় টিআইবি

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি যাচাই-বাছাইয়ের ‘অজুহাতে’ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ স্থগিতের সুপারিশে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে টিআইবি। 

বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কয়েকটিতে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছিল, তার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অন্যতম। কিন্তু অধ্যাদেশগুলো বাতিল ও স্থগিতের মাধ্যমে সরকার আসলে কী বার্তা দিতে চায়? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচারব্যবস্থা সংস্কারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে’ মর্মে যে অঙ্গীকার করেছিল, এই কি তার নমুনা? না কি পরিস্থিতি বিবেচনা করে জনরায়কে প্রভাবিত করার অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন দল ‘শুধু কথার কথা’ হিসেবেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অঙ্গীকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করেছিল! বিগত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ বিরুদ্ধ মত দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকার ভুলে গেল!

অধ্যাদেশ তিনটি হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের দাবি জানিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, দুর্নীতি দমন কশিমন, পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকারবিষয়কসহ স্থগিতের সুপারিশপ্রাপ্ত অধ্যাদেশগুলো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে যাচাই-বাছাই করে অবিলম্বে আইনে পরিণত করতে হবে। এছাড়া দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালনে সক্ষম এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর তথ্য কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

 ‘তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এ তথ্যের সংজ্ঞা, কর্তৃপক্ষের আওতা বৃদ্ধি, কমিশনারদের নিয়োগ, পদমর্যাদা, মেয়াদ প্রভৃতি বিষয় সংশোধন করে সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের দাবি জানানো হয় বিবৃতিতে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে বিবৃতিতে আরও লেখা হয়েছে, একটি কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন হওয়ার যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল; এ অধ্যাদেশ স্থগিত হওয়ার ফলে তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল। মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত বিধানের অভাবে মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে, তা ক্ষমতাসীন দলের প্রধানসহ কর্তাব্যক্তিদের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়! একই সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের জন্য এ অবস্থান আত্মঘাতীমূলক।

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় গুম-খুনের শিকার হওয়া একটি দলের সরকার কীভাবে গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত দুইটি অধ্যাদেশকেও কোনো যৌক্তিকতায় অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের ফাঁদে ফেলে দিল?সেই প্রশ্ন তুলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, আইনে কোনো অন্তর্নিহিত দুর্বলতা থাকলে সেটি অবশ্যই দূর করা যেতে পারে, কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের নামে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলোকে সুবিধা বা দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা বা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের অনুমতির নামে কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ অজুহাত তুলে এটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়।

দুদক অধ্যাদেশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিসহ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জুলাই সনদের বাইরে দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিতভাবে সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে দুদক অধ্যাদেশটি সংশোধন করে অবিলম্বে বিল আকারে সংসদে চলতি সংসদে উত্থাপনের আহ্বান জানাই। এক্ষেত্রে দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ‘একটি স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ সৃষ্টির বিধান, যে ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হওয়া সত্ত্বেও অধ্যাদেশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

বিএনপি সরকার যদি কর্তৃত্ববাদ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকেন, তবে অধ্যাদেশগুলো হুবহু বিল আকারে অবিলম্বে সংসদে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান।

বিবৃতিতে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। টিআইবির যুক্তি, পুলিশকে একটি জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, তার কোনো প্রতিফলনই নেই অধ্যাদেশে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত