বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও গুম

সরকারের পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত আস্থা রাখা কঠিন : টিআইবি

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৮ এএম

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিএনপি নেতৃতাধীন সরকারের সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী এ সংস্থাটি বলছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সরকারের সিদ্ধান্ত পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত এবং সরকারের প্রতি আস্থা রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানম-িতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ‘রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে টিআইবির অবস্থান’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু গ্রহণ করার বিষয়টি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে আইনে পরিণত হতে যাওয়া সব অধ্যাদেশের সবই দুর্বলতাহীন নয়, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে।’ ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশকে রহিত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি একেবারেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এই তিনটি অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি কোনো টাইমলাইনও ঠিক করেনি বা ভবিষ্যতে করা হবে, তার ইঙ্গিতও দেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন, দুদকসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হয়েছে। যদিও সেই সময়কাল সুনির্দিষ্ট নয়। তৃতীয় ধাপে থাকা পুলিশ কমিশনসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে এনে পাসের কথা বলা হয়েছে। যদিও এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দূরীকরণে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাজ করত।  অন্যদিকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, যা চরম দুর্বলতার কারণে সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য, সেটিতে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার বিধান সংযুক্ত করে বিল আকারে পাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এটি হতাশাজনক।’

সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রাখার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নিয়োগ অধ্যাদেশটি রহিত করায় বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আবারও পুরনো ধারায় ফিরে যাবে বা সরকারপ্রধানের ইচ্ছামাফিক হয়ে পড়বে। এটি এক পা এগিয়ে দুই পা পেছনে হাঁটার শামিল। আর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করার পেছনে সরকার যেসব যুক্তি তুলে ধরছে, তার সারমর্ম হচ্ছে বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতের পথ রুদ্ধ করে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা।’

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও গুমপ্রতিরোধ অধ্যাদেশকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়ার বিষয়টি শঙ্কার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর ফলে কমিশনের প্রশাসনিক স্বাধীনতা খর্ব হবে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে বাধা এবং বিচারিক ক্ষমতাকে নির্বাহী ক্ষমতায় রূপান্তরের শঙ্কা রয়েছে। এই অধ্যাদেশ দুটির অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করবে।’

ছয়টি অধ্যাদেশ পুনর্মূল্যায়ন বা সংশোধন করা জরুরি বলে টিআইবি মনে করে। এগুলো হলো দুদক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার সংশোধন অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের পুনর্মূল্যায়ন বা সংশোধন করা জরুরি। এ ছাড়া পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বাতিল চেয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশকে একটি পেশাদার ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠন প্রয়োজন, তার কোনো প্রতিফলনই পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে হয়নি। আর উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশে এমন একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক ও সেবাদাতা। এটি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে।’

অধ্যাদেশ নিয়ে ‘খেলা হচ্ছে’ মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অধ্যাদেশ নিয়ে যে খেলাটা হচ্ছে, সেখানেও আগের মতো ভেতর থেকে প্রতিরোধ আসছে। এখানে দুটি আঙ্গিক আছে : রাজনীতি ও আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রই এখনো আগের মতোই মূল নিয়ন্ত্রক।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব বলেছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, গুম অধ্যাদেশ ও মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ যদি আইনে পরিণত করা হয়, তাহলে গুমের শিকার ও অমানবিকতার শিকার ব্যক্তিরা অন্যায়ের শিকার হবেন। আমরা তাদের দুজনের বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু আস্থা রাখাটা কঠিন হচ্ছে। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তারা যেটা বলছেন, তারা সেটি কাজে রূপান্তর করার ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন না।’ ইফতেখারুজ্জামান আশা প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি অতীতে নিজেদের অনাচারের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগকে স্মরণে রেখে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতে তাদের নিজস্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী অগ্রসর হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও নীতি পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত