ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ট্রাম্পের

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৩ এএম

উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরানকে ফের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন আজ রাতে (যুক্তরাষ্ট্র সময়) একটি পুরো সভ্যতার মৃত্যু হতে যাচ্ছে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না। আমি চাই না এমনটা হোক, কিন্তু সম্ভবত তা-ই হতে চলেছে। বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানকে চুক্তিতে রাজি হতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত ৮টায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ছয়টা) শেষ হয়েছে। তার আগে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, এটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। ৪৭ বছরের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি আর মৃত্যুর শেষ পর্যন্ত অবসান হবে। ইরানের মহান জনগণের ওপর ঈশ্বরের আশীর্বাদ বর্ষিত হোক! একই সঙ্গে তিনি সম্ভাব্য সমাধানের ইঙ্গিতও রেখে দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো ইতিবাচক বৈপ্লবিক কিছুও ঘটতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি চালু করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে পাকিস্তান। তবে এই পরিকল্পনা ‘যথেষ্ট ভালো নয়’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানকে এক রাতেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব। আর তেহরান বলছে- অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, যুদ্ধের পুরোপুরি শেষ চায় তারা। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিও শিগগিরই খোলা হবে না।

ইরান যুদ্ধ থামাতে বেশ কয়েক দিন ধরেই ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এ যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম; বিশ্ব বাজারে সোমবার প্রতি ব্যারেল তেল ছিল ১১০ ডলার। গতকাল যুদ্ধের ৩৯তম দিনেও ব্যাপক পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ফলে বেড়েছে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে দেশটির অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ রেল সেকশন ও সেতুতে বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, আইআরজিসি এসব রেলপথ এবং মহাসড়কের সেতুগুলো ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অস্ত্র ও সামরিক রসদ পরিবহন করছিল। সেই যাতায়াত পথ বন্ধ করে দিতেই এই সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। হামলা শুরুর আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানি নাগরিকদের রেল ভ্রমণ থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছিল। তবে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার পাল্টা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না ইরান। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে- ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সহযোগীদের অবকাঠামোর এমন দশা করব, যা তাদের এবং এই অঞ্চলে তাদের মিত্রদের দীর্ঘ বছরের জন্য তেল ও গ্যাস থেকে বঞ্চিত করবে।’

ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিকেন্দ্র খার্গ দ্বীপের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা এপিকে হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। জেরুজালেম পোস্ট বলছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে দ্বীপটিতে ভয়াবহ বিমান হামলার পর শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। খার্গ দ্বীপে হামলার খবরের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মে মাসে সরবরাহের জন্য প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই তেলের দাম এখন ১১৪ দশমিক ৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরানও। ইসরায়েলের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম ‘আরুৎজ সেভা’ জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভের দিকে ধেয়ে আসা ইরান থেকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র পথিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে। হারেৎজ জানিয়েছে, ইসরায়েলের কিরিয়াত সমনা শহরের একটি স্থাপনায় সরাসরি আঘাতের খবর দিয়েছে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। গাজা উপত্যকাসংলগ্ন ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমি এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন শোনা গেছে। সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরী জুবাইলের পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল আইআরজিসি এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের আসালুয়েহ পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে শত্রুপক্ষের অপরাধ ও আগ্রাসনের জবাবে এই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, তারা মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বেশ কিছু আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে জুবাইলের সাদারা কমপ্লেক্সসহ অন্যান্য স্থাপনায় সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এই প্রকল্পটি সৌদি আরামকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ডাওয়ের একটি যৌথ উদ্যোগ। এ ছাড়া এক্সন মবিলের মালিকানাধীন একটি স্থাপনা এবং নিকটবর্তী জুয়াইমাহর একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাতেও হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি টেলিযোগাযোগ ভবনে মঙ্গলবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এই হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন বলে দেশটির কর্র্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। আমিরাতের চিকিৎসা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি শারজাহতে থুরায়া টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানির একটি প্রশাসনিক ভবনে আঘাত হানে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত