নওগাঁর সাপাহার উপজেলার শতাধিক গ্রাহকের ৩ কোটি টাকা নিয়ে একটি সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা লাপাত্তা হয়েছেন। গ্রাহকরা আমানতের টাকা নিতে এসে দেখেন সমিতির কার্যালয় বন্ধ। মুঠোফোনেও প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না তারা।
প্রতিষ্ঠানটির নাম গ্রাম জনতা শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। আমানতের টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল হালিমসহ প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য পরিচালক ও কর্মকর্তাদের শাস্তি দাবি করেছেন গ্রাহকরা। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সাপাহার উপজেলা সদরের জিরোপয়েন্ট এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ভুক্তভোগীরা। মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একটি প্রতিনিধিদল তাদের সঞ্চিত টাকা ফেরত ও প্রতারকচক্রকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সাপাহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে।
ঘণ্টাব্যাপী চলা মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, সাপাহার উপজেলার গোয়ালা ইউনিয়নের কোচকুড়–লিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম ও স্থানীয় আরও কয়েকজন মিলে ২০১৬ সালে ‘গ্রাম জনতা শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সাপাহার দীঘিরহাট এলাকায় সাইনবোর্ড টানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় আশপাশের এলাকার লোকজন ওই সমবায় সমিতিতে টাকা গচ্ছিত রাখেন। গ্রাহকদের আমানতের বিপরীতে নিয়মিত লভ্যাংশও দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে হঠাৎ সমিতির কার্যালয়টি তালাবদ্ধ করে আমানতকারীদের টাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হালিম আত্মগোপনে চলে যান। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটির শতাধিক গ্রাহক তাদের প্রায় ৩ কোটি টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এরপর তারা উপজেলা প্রশাসন, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
উপজেলার দীঘিরহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের একজন গ্রাহক বলেন, ‘আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। সমিতির এমডি আব্দুল হালিম পূর্বপরিচিত হওয়ায় তার কথায় বিশ^াস করে মুনাফা লাভের আশায় ২০২০ সালে ওই প্রতিষ্ঠানে অবসরভাতার ১৫ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা করেছিলাম। প্রতি মাসে লাখে আড়াই হাজার টাকা করে মুনাফা দেওয়ার শর্তে আমি ওই টাকা জমা দেই। টাকা জমা দেওয়ার পর থেকেই লভ্যাংশ দেওয়া নিয়ে সমিতির লোকজন টালবাহানা শুরু করেন। এর মধ্যেই ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর রাতারাতি আব্দুল হালিম ও সমিতির অন্যান্য লোকজন লাপাত্তা হয়ে যায়। তাদের ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। লাপাত্তা হওয়ার পর প্রায় ২ বছর হতে চললেও প্রতারকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি প্রশাসন।’
ভুক্তভোগী মফিজান বিবি নামের এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি একজন বিধবা। দুই সন্তান নিয়ে সংসার আমার। আমার ছেলেকে বিভিন্ন লোভ দেখিয়ে ৮ লাখ টাকা তারা নেন। এরপর ৮ লাখ টাকার কিছুদিন লাভ দেওয়ার পরে তারা আর টাকা দিচ্ছেন না। আমানতের মূল টাকা ও লভ্যাংশ না পাওয়ায় আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। ওই টাকার ওপর আমার সংসার চলত। দুই বছর সমিতির অফিসে ঘুরোছি। আমি আমার টাকা ফেরত চাই ও আব্দুল হালিমের শাস্তি চাই।’
মানববন্ধন শেষে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের একটি প্রতিনিধিদল সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সাপাহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। স্মারকলিপিতে তারা অবিলম্বে প্রতারকচক্রকে আইনের আওতায় এনে আমানতকারীদের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাপাহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় থানায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তারপরেও বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, ‘গ্রাম জনতা শ্রমজীবী সমবায় সমিতি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের কাছ থেকে স্মারকলিপি পেয়েছি। এ বিষয়ে আইনি বিধিমোতাবেক যথাযথা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
