জ্বালানিতে স্বস্তির আশা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১০ এএম

অবশেষে শর্তসাপেক্ষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই খবরে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি নিয়ে স্বস্তির আশা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি স্বস্তি পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু সময়। সেক্ষেত্রে যদি কোনো কারণে আবার যুদ্ধ লেগে যায় তাহলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ইরানের ওপর মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধের আঁচ লাগে জ্বালানি খাতে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে। জ্বালানি নিয়ে দেশজুড়ে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা। তেল পেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ভোক্তাকে। সরকার প্রায় দ্বিগুণ দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল আমদানি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। তেলের সরবরাহও কমেছে। অন্যদিকে সরকারের আমদানি ব্যয় হয়েছে আকাশচুম্বী। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল।

এমন অবস্থায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির খবর স্বস্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু কতটা স্বস্তি এলো? জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে স্বস্তির।’ এই যুদ্ধ স্থায়ী বন্ধ হলেও সেটা বড় আনন্দের।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে যেসব এলএনজিবাহী জাহাজ আসতে পারেনি সেগুলো বিকল্প উপায়ে সংগ্রহ করেছি। আজও (গতকাল) খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব এলএনজি আমদানি বন্ধ ছিল সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি।’

 সংকটের মধ্যেও এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে উল্লেখ করে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান বলেন, সেজন্য চড়া দামে খোলা বাজার থেকে আমদানি করতে হয়েছে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা আরও সহজ হবে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো এর উচ্চ মূল্য নিয়ে।

উদাহরণ টেনে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব এলএনজি আমদানি করা হয়, সেগুলোর দাম নির্ধারণ হয় আগের মাসের গড় দাম হিসাবে। অর্থাৎ মে মাসে আমদানির জন্য এর দাম নির্ধারণ হবে ১৬ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত গড় দাম বিবেচনা করে। এখন জুন মাসে যে এলএনজি আমদানি করা হবে তার দাম নির্ধারণ হবে মার্চ ও এপ্রিল মাসের গড় দামে। ওই সময় তো এলএনজির দাম খোলা বাজারের চেয়েও অনেক বেশি। ফলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে আগামী কিছুদিন দাম নিয়ে জটিলতায় পড়তে হবে। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে পরিস্থিতি দ্রুতই স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তেলে স্বস্তি ফিরতেও অপেক্ষা : হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে ২ মার্চ থেকে সৌদি আরবের ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল বোঝাই করে নরডিক পুলেক্স নামে একটি জাহাজ আটকে যায়। আরব আমিরাতের তেল এখনো পাওয়া যায়নি। জ্বালানি তেল সরবরাহে বিপাকে পড়ে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা খুব একটা কাজে আসেনি। এর মধ্যে অবশ্য ভারত থেকে ডিজেল আমদানি কিছুটা বেড়েছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আগের চুক্তি অনুযায়ী এপ্রিলে ১৭টি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ৭টি ডিজেলবাহী জাহাজ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করেছে। সবকটি জাহাজ তেল নিয়ে দেশে না এলে বিপাকে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতিতে জ্বালানি খাতে স্বস্তি আশা করছি। কিন্তু কতটা স্বস্তি হবে তা বোঝা যাবে আরও ১-২ দিন পর। আমরা আমাদের সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ক্রুড অয়েলবাহী যে জাহাজ আটকে ছিল তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কেটেছে। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ১৬ ডলার কমে এসেছে। সুতরাং দামে স্বস্তি এসেছে। দাম আরও কমে আসলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে তখনই পুরোপুরি স্বস্তি মিলবে। আমরা আশাবাদী।’

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেল সরবরাহে চাপে পড়ে সরকার। বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও পেট্রোলপাম্পগুলোতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে।

বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও তেলের দাম বেড়ে যায়। সরকার প্রয়োজনে মে মাসে তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়টিও ভাবনায় নেয়।

এলসি-জামানত জটিলতায় ২০ লাখ টন তেল : মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার পর মার্চ ও এপ্রিল মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ টন জ্বালানি তেল টেন্ডার ছাড়াই সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তবে জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া এই উদ্যোগ এখনো কার্যকর হয়নি; এলসি খোলা ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (জামানত) জটিলতায় আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।

যুদ্ধ শুরুর ১১ দিনের মাথায় সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় ৯টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯ লাখ ৮৫ হাজার টন তেল কেনার ৯টি প্রস্তাব অনুমোদন দেয় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এর আগে ২ লাখ ২০ হাজার টন পরিশোধিত তেল আমদানির পৃথক প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অনুমোদনের প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও একটি এলসিও খোলা হয়নি। দেশে আসেনি এক ফোঁটা তেল।

নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহকারীদের এলসি খোলার আগে ৫ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত ৯ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান আংশিক জামানত জমা দিয়েছে, সেটিও শর্ত অনুযায়ী ডলারের পরিবর্তে টাকায়, যা গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ফলে কার্যত স্থবির হয়ে আছে আমদানি প্রক্রিয়া।

এদিকে সরকার স্পট মার্কেট থেকে আরও প্রায় ৭ লাখ টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দিলেও সেখানেও একই চিত্র। নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার পরও বেশির ভাগ সরবরাহকারী প্রয়োজনীয় জামানত জমা দেয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুমোদন পাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তেল সরবরাহ সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক কম দামে প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলারে ডিজেল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে বাজারদর ২০০ ডলারের বেশি। এতে প্রস্তাবগুলোর বাস্তবতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আপাতত জ্বালানির দাম নাও বাড়তে পারে : যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল সরকার। যদিও বিপুল লোকসানের পরও সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে এ মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো থেকে সরে এসেছে সরকার।

কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হওয়ায় আগামী মাস থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চিন্তা করছিল সরকার। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে যুদ্ধবিরতির কারণে আপাতত সরকার দাম নাও বাড়াতে পারে বলে কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন। অবশ্য এটি নির্ভর করবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতার ওপর। তা ছাড়া আজ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও সরকারের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ঋণের শর্ত হিসেবে বিদ্যুৎ-জ্বালানির ভর্তুকি তুলে দেওয়ার একটা চাপ আগে থেকেই দিয়ে রেখেছে তারা। এখন তাদের সেই চাপ কতটা মোকাবিলা করতে পারবে সেটাই দেখার বিষয়।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হয়তো আইএমএফ ভর্তুকির চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিতেও পারে।

তেল নিতে দুর্ভোগ বেড়েছে : যুদ্ধ শুরুর পর পরই জ্বালানি তেল নিয়ে যে চরম দুর্ভোগ আর ভোগান্তি তা এখনো চলছে। এই ভোগান্তি এখন নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে প্রায় ২৪ ঘণ্টায় দেখা যাচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও কোথাও এই লাইন কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে, ফলে সড়কের একাধিক লেন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন এলাকায় পাম্পের সামনে সারিবদ্ধ যানবাহন মূল সড়ক দখল করে রেখেছে। এতে গণপরিবহন আটকে যাচ্ছে, যাত্রীরা বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি চলমান চাপ নয়, বরং স্থির লাইনের কারণে তৈরি হওয়া ‘স্থবির যানজট’।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকা সত্ত্বেও অজুহাতে সীমিতসংখ্যক নজেল চালু রাখা হচ্ছে। এতে একটি গাড়িতে তেল নিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সময় লাগছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তেল মজুদের প্রবণতা এবং বোতল-ড্রামে তেল নেওয়ার কারণে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং গোপনে মজুদের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও প্রশাসন অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

বিশ্ববাজারে কমতে শুরু করেছে তেলের দাম : যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার খবরে বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিকভাবে কমতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর প্রথম এক ঘণ্টায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ কমে বুধবার ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫০ ডলারে নেমে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও প্রায় ১৪ দশমিক তিন শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৬ দশমিক ৮০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্তও প্রতি ব্যারেল তেল ১০০ ডলারের অনেক ওপরে বিক্রি হচ্ছিল।

তেলের দরে বড় পতন দেখা গেলেও সেটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৭০ ডলারের মতো।

যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত