প্রকাশ্য বিরোধে বাড়ছে উদ্বেগ

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে নানা কর্মসূচি, মিছিল ও সাংগঠনিক তৎপরতাকে ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। ক্যাম্পাসে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টায় তারা সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। এতে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ছাত্রদলের দাবি, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। অন্যদিকে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা ও অধিকার নিয়ে তারা কাজ করছেন।

গত ৪ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নসহ সমসাময়িক বিভিন্ন দাবি ছিল প্ল্যাকার্ডে। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দিলে বাগবিত-া হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস থেকে শিবিরকে অপসারণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

ওই ঘটনায় সংগঠন দুটি পরস্পরকে দোষারোপ করে। ঘটনার তদন্তে ৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসন এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলে, এমন কর্মকা- বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত করার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।

ওই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পরস্পরকে দায়ী করে নিজেদের কর্মকা-কে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের পক্ষে বলে জানায়। তবে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের কারণ হিসেবে আধিপত্যের লড়াই, নিজেদের শক্তির জানান দেওয়া ও স্বার্থের দ্বন্দ্বকেই দায়ী করছে।

জবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিভ বলেন, ‘অতীতে ছাত্রলীগ যেমনটা করেছে এখনো তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। ছাত্রদল-ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস ভাগাভাগির প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং এখানে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো ধরনের বিবেচনা কিন্তু তাদের মধ্যে নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনও দলীয় বিবেচনায় কাজ করছে। দুই সংগঠনের দখলদারিত্বও ও সংঘর্ষের ফলে অনেক সাংবাদিক, সাধারণ শিক্ষার্থী আক্রান্ত হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। যার ফলে পুরো ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা একটা রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করেছিল, আমরা সেই শিক্ষার্থীদেরও ভীত হতে দেখছি, ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে শঙ্কিত হতে দেখেছি।’

জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের একটাই লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদ দূর করা, হাসিনার পতন ঘটানো। এ জন্যই আসলে কোটা আন্দোলন থেকে ১ দফা আন্দোলনের সূত্রপাত। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংগঠন তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে কার্যক্রম করেছে। সেই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই জবিতে ছাত্রদল-শিবির এই সংঘর্ষ। আরেকটি বিষয়ও আছে, সেটি আর্থিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজ, টেন্ডার ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়েই দুই সংগঠনের মধ্যে এ রকম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিব বলেন, ‘যদি আগের মতোই মারামারি, সংঘর্ষ হতে থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অনিরাপদ বোধ করবে। আশা করি, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দলের সংগঠনগুলো দায়িত্বশীল হবেন এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস নির্মাণে অবদান রাখবেন।’

ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, ‘এখানে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির দ্বন্দ্ব বিষয় নয়। বিষয়টি হলো ছাত্রশিবিরের দখলদারিত্বের যে রাজনীতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা সফল হয়েছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তা টোটালি ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে তারা ভিক্টিম কার্ড খেলা শুরু করেছে। মূলত তারা যেখানে ব্যর্থ হয় সেখানে কান্নাকাটি শুরু করে দেয় আর যেখানে সফল হয় সেখানে তারা সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তার চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তারা ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে রেখেছে।’

জকসুর জিএস ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ‘স্বার্থ মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়। ২০০২ সালে বুয়েটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি নিহত হওয়ার ঘটনা আজও স্মরণীয়। একইভাবে গত ৪ আগস্টের ঘটনাও আমাদের সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে টিএসসি, নতুন ক্যাম্পাস, দুটি হলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যেগুলো শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এ সব বিষয়ে আমরা যখন প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন তুলেছি এবং জবাবদিহি চেয়েছি, তখনই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘৪ আগস্টের ঘটনায় প্রক্টরের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি চাইলে আরও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন বলেন, ‘এখানে শিবিরের রাজনীতি, ছাত্রদলের রাজনীতি করলে কি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নত হবে। এই ধরনের সংঘাত আসলে কাম্য নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কাজ করা উচিত। এই সংঘাত শুধু জগন্নাথের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য সমস্যা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন না বিরোধী দল, সরকারি দল সবাইকে এই বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। জাতীয়ভাবে এর সমাধান দরকার।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত