যেভাবে দূরত্ব বাড়ে ছাত্রদল-শিবিরে

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৯ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনগুলোয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ হয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিল। সামনের সারিতে ছিল দল দুটির ছাত্র সংগঠন যথাক্রমে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরও। তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই সংগঠনের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সেই দূরত্ব এখন গড়িয়েছে প্রকাশ্য বাগযুদ্ধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সংঘর্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বিভিন্ন ঘটনা ও ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে এক সময়ের দুই সহযোদ্ধা সংগঠন।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) আধিপত্যের অবসান ঘটে। হলগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হলগুলোতে নিজেদের শক্তি বাড়াতে তৎপর হয় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি। ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির অভিযোগ, ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ও ব্যাচ প্রতিনিধির আড়ালে শিবির হলগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করছে এবং গোপনে কমিটি দিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে। শিবির অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। এরই মধ্যে গত বছরের আগস্টে ছাত্রদল হলগুলোতে কমিটি দিলে এর তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করে শিবির। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে সেই সময়ে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ জানান, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী আবাসিক হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে।

এর আগে, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে প্রকাশ্যে আসেন ঢাবি শিবির সভাপতি সাদিক কায়েম। পরদিন সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদের পরিচয় প্রকাশ পায়। ২ অক্টোবর ১৪ সদস্যের প্রকাশ্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে ঢাবি শিবির। এরপর শিবিরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির প্রচার আরও জোরালো হয়।

ছাত্রদলের কমিটিতে ‘সাবেক ছাত্রলীগ’ বিতর্ক : জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ঢাবি ছাত্রদলের কর্মসূচিতে সীমিত উপস্থিতি থাকলেও পরে শিক্ষার্থীদের যোগদান বাড়ে। অভিযোগ ওঠে, সাবেক ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী ছাত্রদলে যোগ দিয়েছেন। কমিটি প্রকাশের পরও ‘সাবেক ছাত্রলীগ’ নেতাদের পদ পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঢাবির বিভিন্ন হলের ছাত্রদল কমিটিতে ৫৪ জন ছাত্রলীগ নেতা পদ পেয়েছেন। এ নিয়ে সমালোচনার পর তথ্য গোপনের অভিযোগে ছয়জনকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার করা হয়। তবে তাদের কয়েকজনকে এখনো ছাত্রদলের কর্মসূচিতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদলের ব্যাপক সমালোচনা করে শিবির।

জাইমা রহমানকে নিয়ে পোস্ট ঘিরে উত্তেজনা : চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে জাইমা রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে অশালীন পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সারা দেশে বিক্ষোভের ডাক দেয় ছাত্রদল। অভিযুক্ত শিক্ষার্থী থানায় জিডি করতে গেলে থানা অবরুদ্ধ করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় ডাকসু নেতারা সেখানে গেলে ছাত্রদল তাদের মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। এর আগে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির কয়েকজন সদস্যও হামলার শিকার হন। একই দিনে বিজয় একাত্তর হলের দেয়ালে ‘গুপ্ত’ লেখার কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে শিবিরের এক নেতার বিরুদ্ধে। পরে ছাত্রদল শিবিরবিরোধী বিক্ষোভ করে।

ডাকসু নির্বাচনেও মুখোমুখি : ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচনে ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদসহ ২৮ পদের ২৩টিতে জয় পায় শিবির প্যানেল। নির্বাচন ঘিরে আগে থেকেই দুই সংগঠনের সামাজিক মাধ্যমে বাগযুদ্ধ চলছিল। জয়ের পর শিবির কারচুপি করে জয়ী হয়েছে এবং ‘শত কোটি টাকা খরচ’ করে উল্লেখ করে ডাকসুকে ‘নীলক্ষেতের ডাকসু’ বলে প্রচারণা চালায় ছাত্রদল। তাছাড়া, হল সংসদে শিবির গুপ্তভাবে কার্যক্রম চালিয়ে জয় পেয়েছে বলেও অভিযোগ করে তারা। পরবর্তী সময়েও ডাকসুর বিভিন্ন কর্মকা-ের সমালোচনা করে ছাত্রদল।

সমকামী ইস্যুতে হাতাহাতি : গত ২ আগস্ট ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। হল সংসদের শিবির সমর্থিত এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুজন অতিথির বিরুদ্ধে ‘সমকামী কর্মকা-ে’ জড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে তদন্ত কমিটি গঠন কার্যক্রম চলার সময় এ ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়ার দাবি করে। এর প্রতিবাদে শিবির বিক্ষোভ মিছিল করে। ছাত্রদলও শিবিরের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করে।

গত ১১ আগস্ট সূর্যসেন হলে দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ উঠলে তাদের হল থেকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। অভিযুক্তদের একজনকে ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা গেলে এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে শিবির নেতাকর্মীরা।

২০২৪ থেকেই বাগযুদ্ধ : ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ঢাবির ‘রাজাকার ঘৃণাস্তম্ভে’ জুতা নিক্ষেপ করে ছাত্রদল ও বামপন্থি শিক্ষার্থীরা। পেছনের দেয়ালে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদসহ যুদ্ধাপরাধে দন্ডিতদের ছবি সাঁটানো হয়। এ নিয়ে ছাত্রদল-শিবিরের ব্যাপক বাগযুদ্ধ হয়।

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট টিএসসিতে ‘৩৬ জুলাই : আমরা থামব না’ প্রদর্শনীতে মতিউর রহমান নিজামী, দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মুজাহিদ, মীর কাশেম আলী, কামারুজ্জামান ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হলে ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি ও বামপন্থিরা বিক্ষোভ করে। পাল্টাপাল্টি স্লোগানে উত্তেজনা তৈরি হলে প্রক্টরিয়াল টিম ছবিগুলো সরিয়ে দেয়। পরদিন সেখানে খালেদা জিয়ার বক্তব্যসহ নতুন পোস্টার লাগানো হয়। এ ছাড়া গত বছর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে গালি দিয়ে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ ওঠে শিবিরের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদে বিক্ষোভ করে ছাত্রদল।

চাঁদাবাজি ও ফুটবল নিয়ে বিরোধ : চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে। ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা ফেসবুকে ছাত্রদলের তিন নেতা ও ছাত্রশক্তির এক নেতাসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে ছবি-ভিডিওসহ অভিযোগ প্রকাশ করেন। ডাকসু, হল সংসদের নেতারা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন।

চলতি বছরের ১ জুলাই কবি জসীমউদদীন হল মাঠে বড়পর্দায় ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল দেখানো নিয়েও ছাত্রদল ও শিবির-সমর্থিত হল সংসদের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে। ছাত্রদলের অভিযোগ, শিবির-সমর্থিত নেতারা খেলা দেখানো বন্ধ করে দিয়েছেন। হল সংসদের দাবি, খেলা প্রদর্শনের নামে মাঠে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজি হচ্ছিল। এ ঘটনায় প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদল।

এসব ঘটনা ছাড়াও ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক ইস্যুতে সামাজিক মাধ্যমে মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যায় শীর্ষ দুই ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় একই লক্ষ্যে রাজপথে থাকা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সম্পর্ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একই আন্দোলনের মাঠে ছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের মধ্যে এত দ্রুত দূরত্ব তৈরি হলো কেন? রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কৌশলের পার্থক্য, নাকি ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতাই মুখ্য?

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের অভিযোগ, ছাত্রশিবির সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি নানা কৌশলে ক্যাম্পাস ও হলগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। অথচ শিবির নেতারা বলে, হলগুলোতে তাদের কমিটি ও কার্যক্রম নেই। তাহলে ৫ আগস্টের পর হলগুলো কারা দখল করল?

তিনি বলেন, পাঁচ আগস্টের পর তারা গুপ্ত অবস্থায় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখছে। বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে বিএনপি ও ছাত্রদল নিয়ে নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, এই বিষয়গুলো ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

হল দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাবি শিবির সভাপতি মু. মহিউদ্দিন খান বলেন, অভিযোগগুলো অবান্তর। হলগুলো নির্বাচিত হল সংসদ ও প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণে শিক্ষার্থীদের চাওয়া অনুযায়ী চলছে। এতে শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট রয়েছে। এটা সহ্য করতে না পারলে আমরা মনে করি তারা জনবিচ্ছিন্ন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকায় এমন ডেস্পারেট (মরিয়া) আচরণ করছে। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে সবার একটাই উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন। কিন্তু পরে সবাই গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোকে উত্তপ্ত করছে, ভিন্ন মতের ওপর হামলা করছে, যা রাজনৈতিক আদর্শ প্রকাশের উপায় হতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত