আধিপত্যের রাজনীতি ফিরছে ক্যাম্পাসে

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২ এএম

জুলাই আন্দোলনে সবার লক্ষ্য ছিল এক- ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন। আন্দোলনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক মতের শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পতনের পর বদলে গেছে রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। কোথাও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, কোথাও সংঘর্ষ, আবার কোথাও প্রকাশ্য আধিপত্যের লড়াই। ফলে জুলাই-পরবর্তী ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন যে আধিপত্যের রাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, সেই রাজনীতিই কি নতুন পরিচয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসছে?

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের আধিপত্য থাকার পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির দুই সংগঠনই নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি কে ক্যাম্পাসে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, কে আবাসিক হল বা সাংগঠনিক কর্মকা-ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এসব প্রশ্ন বিবেচনায় আসছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং জুলাই পরবর্তী সময়ে দলীয় পরিচয়ের বাইরেও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে ছাত্রশিবির যে শক্ত অবস্থান গড়েছে তাকে জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে শক্তভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে ছাত্রদল।

ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আন্দোলনের অভিন্ন লক্ষ্যই বড় হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে। কিন্তু এখন সেই ঐক্যের জায়গায় ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে সাংগঠনিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। উভয় পক্ষই নিজেদের সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির বাহক দাবি করে অন্যকে ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্টের জন্য দায়ী করছে। ছাত্রদল মনে করে, ছাত্রশিবির স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে নর্মালাইজ করার চেষ্টা করছে এবং নিজেদের ধর্মীয় ভাবনা পুঁজি করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদ উসকে দিচ্ছে। জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রশাসনে জামাত-শিবির ঘরানার আধিপত্য থাকার ফায়দা নিয়ে শিবির ক্যাম্পাসে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। ফলে অনেকটা কোণঠাসা থেকে রাজনীতি করতে হয়েছিল ছাত্রদলকে। অপরদিকে ছাত্রশিবির মনে করে, ছাত্রদল দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করতে চায়। তারা সরকারি দলের সহযোগী সংগঠন হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশের সহযোগিতা পাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৫ আগস্টের পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘এককভাবে’ নিয়ন্ত্রণে নেয় ছাত্রশিবির। ২০২৫ সালের ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হয়। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একক আধিপত্য দেখিয়েছে তারা। তারা চায় ছাত্র সংসদকে কাজে লাগিয়ে এ আধিপত্য ধরে রাখতে। তারা মনে করে, এতে তারা জাতীয় রাজনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। অপরদিকে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা যেকোনো উপায়ে ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ছাত্রলীগের পুরনো আধিপত্যের জায়গায় যদি ছাত্রদল বা ছাত্রশিবিরের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে কি ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন হবে? নাকি শুধু আধিপত্যকারী সংগঠনের নাম বদলাবে?

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার দিকে তাকালে পরিস্থিতির পরিবর্তন স্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল সংসদের ছাত্রশিবির সমর্থিত এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই বহিরাগত অতিথির বিরুদ্ধে ‘সমকামী’ কর্মকা-ে জড়ানোর অভিযোগ ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দ-িত কয়েকজন নেতার ছবি সংবলিত বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থান নেন সংগঠন দুটির নেতারা। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ইস্যুতে মারামারিতে জড়ায় ছাত্রদল ও শিবির। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই মারামারিতে তাদের সহযোগী সংগঠনের বহিরাগত নেতারা সশস্ত্র অবস্থান নেয়। একই ঘটনা ঘটে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায়। যে কোনো ক্যাম্পাসে মারামারি বা উত্তেজনার ঘটনা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে অন্য ক্যম্পাসে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রদল বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র মজুদ করছে। অন্যদিকে ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন আবাসিক হলে অস্ত্রশস্ত্র রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ক্ষমতাবান দুই দল মারমুখী অবস্থানে তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত না থাকা শিক্ষার্থীদের অনেকেই সংঘর্ষ, মিছিল, হল নিয়ন্ত্রণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চাপের আশঙ্কা করছেন।

দুই সংগঠনের বক্তব্য কী?:

ছাত্রদলের নেতারা দাবি করছেন, তারা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং কোনো ধরনের দখলদারিত্বের রাজনীতির পক্ষে নন। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতারাও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণের রাজনীতির কথা বলছেন।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে। কেউ যখন আক্রমণ করতে আসে ছাত্রদল কেবল প্রতিহত করছে। কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্রদল সরাসরি আক্রমণ করেনি। আগামীতে ক্যাম্পাস অশান্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্রদল চায় ক্যাম্পাস স্থিতিশীল থাকুক, শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকুক। ক্যাম্পাস শান্ত রাখতে নেতাকর্মীদের সচেষ্ট থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, ছাত্রদল হামলা করলে শিবির কেবল প্রতিরোধ করেছে। কেউ যদি আক্রমণ না করে তাহলে আমাদের দিক থেকে কোনো উসকানি থাকবে না।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা:

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদুল ইসলাম মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে নিজেদের স্বার্থে। এরমধ্যে সাধারণ ছাত্রদের কোনো স্বার্থ নেই। এসব সংঘাতে শিক্ষার্থীরা আহত হচ্ছেন, শিক্ষার সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছাত্রলীগকে অতীতে দেখতাম মারামারি করে বলত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ও ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে তারা কাজ করছে। আদতে এসব দলীয় স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া কিছুই নয়।’

সামনে কী?

জুলাই অভ্যুত্থান যদি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে। ছাত্ররাজনীতি থাকবে কি থাকবে না এই বিতর্কের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছাত্ররাজনীতি থাকলে সেটি কেমন হবে? ক্যাম্পাস কি হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষা ও গবেষণার জায়গা, নাকি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র?

জুলাইয়ের রাজপথে যারা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন, তারা এখন যদি ক্যাম্পাসে মুখোমুখি হন, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রশ্নটি খুবই সরল ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পর তারা কি শুধু ক্ষমতার পালাবদল চেয়েছিলেন, নাকি চেয়েছিলেন রাজনীতির সংস্কৃতিরও পরিবর্তন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত