দুই ছাত্র সংগঠনই সতর্ক অবস্থানে

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য মুখোমুখি অবস্থান এড়িয়ে চলছে দুই সংগঠন। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতপার্থক্য, হল দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হলেও সরাসরি সংঘাতের পথে না গিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করা ও কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে উভয় পক্ষের তৎপরতা। সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে রাবিতে দুই সংগঠনের প্রকাশ্য সংঘাতে না জড়ানোর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক কার্যক্রম, বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি এবং আবাসিক হলকেন্দ্রিক অবস্থান ঘিরেই নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে উভয় সংগঠন। ক্যাম্পাস-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরাসরি সংঘাতে জড়ালে উভয় পক্ষেরই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই পরিস্থিতি বুঝে সতর্কভাবে এগোচ্ছে দুই সংগঠন।

তবে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা যে একেবারেই নেই, তা নয়। এর আগে আবাসিক হল দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। এ অভিযোগে শাখা ছাত্রশিবির মানববন্ধনও করে। যদিও ছাত্রদল অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে এবং ছাত্রশিবির উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যাচার করছে বলে প্রতিবাদ জানায়।

এর মধ্যেই কয়েক দিন আগে প্রেমঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রক্টর অফিসে রাকসু জিএস কর্তৃক এক শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ, এরপর রাকসু ভবনে হামলা এবং পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে মারধরের ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সংঘর্ষের জন্য ছাত্রদল ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে এবং এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে। ফলে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনার নতুন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি হলেও তা সরাসরি ছাত্রদল-শিবির সংঘাতে গড়ায়নি।

উত্তেজনার মধ্যেও সংঘাত এড়ানোর হিসাব : রাবিতে সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতিতে আবাসিক হল, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ, বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও প্রভাব ধরে রাখতে দুই সংগঠনই সক্রিয় রয়েছে। তবে এ অবস্থায় সরাসরি সংঘাতে জড়ালে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও চাপ তৈরি হতে পারে এমন হিসাব থেকেই দুই পক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক-সংশ্লিষ্টরা।

সংঘাত নয়, দায়িত্বশীল রাজনীতির কথা ছাত্রদলের : ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে দল কী ভাবছে এমন প্রশ্নের জবাবে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ছাত্রদল একটি বিশাল ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন। এই সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী শাহাদাতবরণ করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দেশবাসীর ছাত্রদলের প্রতি অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই ছাত্রদলকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

তিনি বলেন, কারও উস্কানিতে ছাত্রদল সিদ্ধান্ত নেয় না, নেবেও না। পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, সংগঠনের নীতি ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করেই ছাত্রদল তার কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আমাদের লক্ষ্য কোনো সংঘাত সৃষ্টি করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও সহাবস্থানমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচার দাবি করেন রাহী। তিনি বলেন, রাবিতে কিছুদিন আগেও সংঘাত হয়েছে, বিশেষ করে শিবির বনাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শিক্ষার্থীদের ওপর যেকোনো হামলা, নিপীড়ন বা অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদ করছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, শিবির মানেই সন্ত্রাস, এটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাদের আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অপরদিকে, ছাত্রদলের রাজনৈতিক বিশ্বাসের মূল জায়গা হলো সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র। তাই আদর্শগতভাবে ছাত্রদল কোনো বিদেশমুখী বা দেশবিরোধী রাজনৈতিক দর্শনকে সমর্থন করে না।

উস্কানিতে পা না দেওয়ার বার্তা শিবিরের : একই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। সে জায়গা থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, রাবি যেন শান্ত থাকে। আমরা কোনো সংঘাতে জড়াতে চাই না এবং সংঘাতের দিকে যেতেও চাই না। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে যা যা করা দরকার, আমরা তা করছি এবং ভবিষ্যতেও করব।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ওপর আঘাত করা হচ্ছে। সে জায়গা থেকে রাবিতে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেজন্য তারা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। শান্ত রাবি যেন কোনো ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় এবং শিক্ষার্থীরা যেন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পড়াশোনা করতে পারে, সে বিষয়ে তারা আন্তরিক।

মেহেদী হাসান আরও বলেন, কেউ উস্কানিমূলক কথাবার্তা বললে বা ফেসবুকে উস্কানিমূলক পোস্ট করলেও সেই উস্কানিতে পা দেবেন না। কেউ সংঘাতে জড়াতে চাইলেও সেটি কীভাবে প্রতিরোধ বা প্রতিহত করা যায়, আমরা সে চেষ্টা করব।

নজরদারিতে প্রশাসন : ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বদা সচেতন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে আমরা মনে করছি। যেহেতু রাজনৈতিকভাবে সংঘাতগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে, তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আশঙ্কা দেখছি না। যদি কোনোভাবে সংঘাত হয়ও, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন রয়েছে। তবে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের সংঘাত হওয়ার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা এখন পর্যন্ত নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত