সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকা- নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গতকাল বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এর আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান ছিল না। তখন বলা ছিল, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। অধ্যাদেশে সংশোধনী এনে সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়। এটিকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস হলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করেন। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘এ-সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক শিট তারা ৩ থেকে ৪ মিনিট আগে হাতে পেয়েছেন। সেটি পুরো পড়তে পারেননি। এটি অবশ্যই একটি স্পর্শকাতর আইন। আইনটি পাসের জন্য তাদের আরেকটু সময় দেওয়া হোক।’
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আপত্তি জানানোর নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময়ে আপত্তি হলে গ্রাহ্য করা যেত। বিলের এ পর্যায়ে এসে আর আপত্তির সুযোগ নেই।’ জবাবে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে শিটটি পেয়েছি এইমাত্র।’ তখন স্পিকার বলেন, ‘বিষয়টি হয়তো পরে দেখা যাবে, বিলের এ পর্যায়ে আপত্তির সুযোগ নেই।’ পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে পাস করার প্রস্তাব করেন। এ সময় তিনি বলেন, বিলটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ছিল, তা সংশোধনের জন্য। বিরোধীদলীয় নেতার নিশ্চয়ই স্মরণ থাকার কথা, তারা এবং এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটি বাংলাদেশে একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধনটাও স্থগিত হয়ে আছে। এ আইনের অনুবলে পরবর্তী সময়ে ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টের পরিবর্তন এনে সংগঠনের বিচারে বিধান যুক্ত করে সেই আইনটাও সংশোধন করা হয়েছে।
পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে।
বিলে বলা হয়েছে, উক্ত সত্তা কর্তৃক বা এর পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক মাধ্যম বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসমক্ষে বক্তব্য প্রদান নিষিদ্ধ থাকবে।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিয়ে অধ্যাদেশ পাস : জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গতকাল বুধবার এ-সংক্রান্ত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতি গত ২৫ জানুয়ারি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ’ জারি করেছিলেন। বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহার করা হবে। এ ছাড়া নতুন কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে করা আইনত নিষিদ্ধ হবে। বিলে আরও বলা হয়েছে, কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করার কারণে করা হয়ে থাকলে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সরকার নিযুক্ত কোনো আইনজীবী এ প্রত্যয়নের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে আবেদন করবেন। এ আবেদনের পর আদালত ওই মামলা বা কার্যধারা সম্পর্কে আর কোনো কার্যক্রম নেবেন না। তা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিলম্বে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা ক্ষেত্রমতে খালাসপ্রাপ্ত হবেন।
বিলে বলা হয়, এ বিধান সত্ত্বেও কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হত্যাকা- সংঘটনের অভিযোগ থাকলে তা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দাখিল করা যাবে এবং কমিশন এ অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নেবে। তবে যে ক্ষেত্রে হত্যাকা-ের শিকার ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সে ক্ষেত্রে কমিশন ওই প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর বর্তমান বা পূর্বে কর্মরত কোনো কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন না। তদন্ত চলাকালে আসামিকে গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তদন্ত কর্মকর্তা যুক্তিসংগত কারণ উল্লেখ করে আগে কমিশনের অনুমোদন নেবেন।
বিলে বলা হয়, যদি কমিশনের তদন্তে প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অপরাধমূলক অপব্যবহার ছিল, তাহলে কমিশন সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। এরপর আদালত ওই প্রতিবেদনকে পুলিশ প্রতিবেদন সমতুল্য গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রম নেবে। এ ছাড়া কমিশনের তদন্তে যদি প্রতীয়মান হয় যে, অভিযোগে উল্লিখিত কার্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ ছিল, তাহলে কমিশন মনে করলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে আদেশ দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোনো আদালতে সংশ্লিষ্ট কার্য-সম্পর্কিত কোনো মামলা করা যাবে না কিংবা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা নেওয়া যাবে না।
জাতির পিতার পরিবারের বিশেষ নিরাপত্তা আইন বাতিল : ‘জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ রহিত করে জাতীয় সংসদে বিল পাস করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শেখ পরিবারের সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধাদি বাতিল হলো। গতকাল বুধবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিল আকারে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর ‘জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ গেজেট আকারে জারি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২৫ মে এই আইনের অধীনে পরিবারের সদস্যদের বিশেষ নিরাপত্তা ও সুবিধাদি প্রদানের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, কেবল একটি পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য আইনটি করা হয়েছিল, যা ছিল সুস্পষ্ট বৈষম্য। এ বৈষম্য দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনটি রহিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বরে ‘জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশটিই এখন স্থায়ী বিল আকারে সংসদে পাস করা হলো।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা এ আইনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবিত দুই কন্যা এবং তাদের সন্তানদের জন্য আজীবন বিশেষ নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় বাসভবনসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। গতকাল বুধবার বিলটি পাসের মাধ্যমে সেই আইনি বাধ্যবাধকতা ও সুবিধা বিলুপ্ত হলো।
হাসনাতের আপত্তি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব : ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) বিল’ উত্থাপনে আপত্তি জানান বিরোধী দল এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। এটি নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে বিতর্ক হয়।
বিলে আপত্তি দিয়ে দেওয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে হাসনাত বলেন, এ বিলটি পাস করার আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়ের সুরাহা জরুরি। কারণ, ইনডেমনিটির বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে যে দলীয়করণ হবে না, ‘বাপের দোয়া মানবাধিকার কমিশন বা বিরোধী দল দমন কমিশন’ করা হবে না, সে বিষয়ে আস্থা তারা রাখতে পারছেন না।
হাসনাতের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারা বাংলাদেশ ব্যাংক দখল করেছিল, তা মানুষ জানে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কারা দখলে নিয়েছিল, তা তিনি বলতে চান না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন করতে চান। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে উত্থাপনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়। হাসনাত আবদুল্লাহর আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলটি সংসদে তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে পাস হয়।
আরও ১৩ বিল পাস : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাস করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গতকাল আরও ১৩টি বিল পাস হয়েছে। বিলগুলো হলো ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আইন,২০২৬, ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬, ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি জামালপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) আইন, ২০২৬, ‘জাতির পিতার পরিবারের সদস্যগণের নিরাপত্তা রহিতকরণ আইন, ২০২৬, স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬, পরিত্যক্ত বাড়ি (সম্পূরক বিধানাবলী) আইন, ২০২৬, ‘বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (ঝঢ়বপরধষ ঝবপঁৎরঃু ঋড়ৎপব) (সংশোধন) আইন,২০২৬, ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬, ‘বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬ এবং কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬। এর আগে তিন দিনে ২৩টি বিল পাস হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৯টি বিল পাস হয়েছে।