চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে পুলিশের দুজনকে মৃত্যুদন্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। ৩০ আসামির ২৫ জনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা। পুলিশের আটজন, বেরোবির তখনকার উপাচার্য (ভিসি) হাসিবুর রশীদসহ চার শিক্ষক, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের ৯ নেতা, এক চিকিৎসক ও বিশ^বিদ্যালয়ের আট কর্মচারী সাজা পেয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। তিন বিচারকই রায়ের সারসংক্ষেপ বাংলায় পড়ে শোনান। জুলাই অভ্যুত্থান দমনে ব্যাপক হত্যাকা-, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি চতুর্থ রায়।
আবু সাঈদ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। ঘটনার দিন পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের ভিডিওটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার মৃত্যুতে আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা পায়, যা পরে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
কোন আসামির কী সাজা : পুলিশের সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তারা কারাগারে আছেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পুলিশের তিনজন হলেন সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ও সাবেক উপ-পরিদর্শক এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায় এ তিনজন পলাতক।
বেরোবির সাবেক ভিসি (উপাচার্য) মো. হাসিবুর রশীদকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি পলাতক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে; তিনি কারাগারে। বেরোবির গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান ম-লকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তারা পলাতক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেলকে ৫ বছর ও সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমানকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। রাফিউল গ্রেপ্তার আছেন। হাফিজুর রহমান পলাতক।
বেরোবির সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তিনিও পলাতক।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক কর্মচারী মোহাম্মদ নুরুন্নবী ম-লকে ৩ বছর, সাবেক নিরাপত্তাপ্রহরী নুর আলম মিয়াকে ৩ বছর, সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মাহাবুবার রহমানকে ৫ বছর ও সাবেক এমএলএসএস একেএম আমির হোসেনকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
বেরোবির রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার হাজতবাসকালকে সাজার মেয়াদ গণ্য করে দন্ডাদেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। অন্য কোনো মামলা না থাকলে সাজার মেয়াদ সমাপ্ত বিবেচনায় তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া, রংপুর মহানগর পুলিশের (আরএমপি) সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে ১০ বছর, আরএমপির সাবেক উপকমিশনার মো. আবু মারুফ হোসেনকে ৫ বছর ও সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শাহ নূর আলম পাটোয়ারীকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তিনজনই পলাতক। এ মামলার আসামি চিকিৎসক মো. সরোয়ার হোসেনকে (চন্দন) ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তিনিও পলাতক।
নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের বিশ^বিদ্যালয় শাখার ৯ জন বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডিত হয়েছেন। বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহাফুজুর রহমান, সহ-সভাপতি মো. ফজলে রাব্বি, সহ-সভাপতি মো. আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ও দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেনকে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাসুদুল হাসানকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তারা সবাই পলাতক। বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী আকাশকে দেওয়া হয়েছে ৫ বছর কারাদন্ড।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় শুনতে সকাল থেকে ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনে আসতে থাকেন তার স্বজন, আসামিপক্ষের আইনজীবী, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা। বেলা ১১টার দিকে প্রসিকিউশন জানায়, দুপুর ১২টায় রায় ঘোষণা করা হবে। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এজলাসে বসেন। এর কিছুক্ষণ আগে কারাগারে থাকা ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালের ডকে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার শুরুতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী আবু সাঈদের বীরত্ব ও তাকে হত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘এটা হলো চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়।’ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ মামলায় আসামি ৩০ জন; ২৫ জন সাক্ষী। আমরা রায়ের সারসংক্ষেপ পড়ব।’ এরপর রায় পড়া শুরু করেন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ বলেন, ‘পুরো রায়টি এখন পর্যন্ত ৫৯১ পৃষ্ঠার। তবে, রায়ের অনুলিপি প্রকাশের পর তা ৫০০ পৃষ্ঠার হতে পারে।’ এরপর সাজার অংশটুকু পড়ে শোনান চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
রায়ে অসন্তোষ সাঈদ পরিবারের : মামলার রায় প্রকাশের পর আবু সাঈদের পরিবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় যারা আদেশ দিয়েছে, সেই পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তারাই তো বেঁচে গেল। কনস্টেবল পুলিশের ওপর দিয়ে গেল। আমি সবার ফাঁসি চাই।’ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ছেলে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে। আরও বেশি আসামির ফাঁসি হলে খুশি হতাম।’ শহীদ আবু সাঈদের বড়ভাই আবু রায়হান বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যার সঙ্গে যারা যারা জড়িত, তাদের সবার ফাঁসি কার্যকর চাই।’
আবু সাঈদ হত্যার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বেরোবির ভিসি অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেন, ‘এ রায়ে বিভিন্ন ধারায় কাউকে মৃত্যুদন্ড আবার কাউকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি রংপুরে কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম না। ঘটনার সাক্ষীদের সন্তোষ্টি মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্তোষ্টি, শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সন্তোষ্টি মানে আমাদের সন্তোষ্টি।’
আবু সাঈদের সহপাঠীরা সন্তোষ্টি প্রকাশ করলেও অনেকেই লঘুদন্ড হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন।
‘সরকারের হুকুম পালন করেছি, জয় বাংলা’ : রায়ের পর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি আমির হোসেনকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘আমি সরকারের চাকরি করি, আমি সরকারের গোলাম, এই রায় মানি না। যারা প্রকৃত আসামি তাদের আসামি করে নাই।’ তাকে কয়েকজন পুলিশ দ্রুত হাজতখানায় নিয়ে যেতে থাকলে আমির হোসেন চিৎকার করে ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিতে থাকেন। হাজতখানা থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় তিনি বলতে থাকেন, ‘পুলিশ হত্যার বিচার চাই, পুলিশ হত্যার বিচার হবে হবে।’ ৫ বছর সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা এমরান চৌধুরী আকাশও ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর পরবর্তী আইনি সিদ্ধান্ত : চিফ প্রসিকিউটর
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেহেতু ৩০ জন আসামি। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম চার্জ (অভিযোগ) আনা হয়েছিল। একেকজনের বিরুদ্ধে একাধিক চার্জ আনা হয়েছে। প্রত্যেক আসামির অপরাধ বিবেচনায় সাজা দেওয়া হয়েছে। সাজা কারও কম অথবা বেশি হতে পারে। বিচারকরা সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সাজা দিয়েছেন।’ অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় পেয়ে পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
রায়ে সংক্ষুদ্ধ আসামিপক্ষ : আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আসামি আমির হোসেনের (মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত) পক্ষে শুনানি করেছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আবু সাঈদের পরিহিত কাপড়ে কোনো গুলির চিহ্ন ছিল না। তার গায়ে কোনো গর্তও ছিল না। বিষয়টি আমরা শুনানিতে উপস্থাপন করেছিলাম। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। রায়ের কপি হাতে পেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করব। আশা করি, সেখানে ন্যায় বিচার পাব।’
গণআন্দোলনের প্রতীক আবু সাঈদ : ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আন্দোলনের সময় বেরোবির সামনে পার্ক মোড়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে গুলি করে পুলিশ। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান। তিনিই ছিলেন গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ। আবু সাঈদ বিশ^বিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ হত্যাকা-ের পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। প্রতিবাদে সোচ্চার হন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এভাবেই তিনি গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
বিচার প্রক্রিয়া: আবু সাঈদ হত্যা মামলার তদন্ত শেষে ৩০ জনকে আসামি করে দেওয়া হয় তদন্ত প্রতিবেদন। গত বছরের ৩০ জুন তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ২৮ আগস্ট প্রসিকিউশন পক্ষের সূচনা বক্তব্য ও আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বিচারকালে মোট ২৫ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও পুলিশ সদস্য ছিলেন। গত ২০ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে যুক্তিতর্কের শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে প্রসিকিউশন পক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অকাট্য প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে সর্বোচ্চ সাজার আরজি জানায়। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি উল্লেখ করে খালাসের আরজি জানান। ২৭ জানুয়ারি মামলার সর্বশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করা হবে মর্মে অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। গত ৫ মার্চ রায়ের জন্য ৯ এপ্রিল (গতকাল) দিন ধার্য করা হয়।
