গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পোশাকশিল্পের ৫০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। এই অভিমত পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, নেতা ও উদ্যোক্তাদের। প্রায় প্রতিটি পোশাকশিল্পের সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে আসার মূল কারণ গ্যাসের সংকট। দেশের ব্যবহারযোগ্য গ্যাসের ওপর নির্ভরতা অনেক আগেই কমেছে। সেই ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানি করা হচ্ছে এলপিজি ও এলএনজি। আমদানিকৃত পণ্যের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা গেলেও এখন প্রায় নিয়মিত লোডশেডিং করা হচ্ছে। আর তারই কুফল পড়ছে শিল্প খাত কৃষি, বাণিজ্য, পরিবহন, উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে। কম উৎপাদন হওয়ার মানে হচ্ছে, চাহিদার অনেকটাই দুর্লভ হচ্ছে। বাড়ছে পণ্যের দাম। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। আমরা হারাচ্ছি রপ্তানি বাণিজ্যের আয়। অন্যান্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও নামছে অস্বস্তি ও ভয়। এই পরিস্থিতি নিবারণে সরকার কি পদক্ষেপ নিচ্ছে? গত বৃহস্পতিবার মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশে তার প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় চেম্বারের সভাপতি বলেছেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। প্রতি কনটেইনারকে অতিরিক্ত ৫শ থেকে ৪ হাজার ডলার বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।’ বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ, সংগ্রহ এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান জোরদার করার কথা বলেছেন তিনি।
দেশের সংকট বহুমুখী। তবে জ্বালানি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের তেল-গ্যাসের উৎস রয়েছে কিন্তু সেগুলো পরিপূর্ণভাবে উত্তোলনের আওতায় আনা হয়নি। বরং নতুন নতুন অনুসন্ধান না করে, আমদানিতে নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেওয়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে আমদানিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া যে ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ছিল তা বলা বাহুল্য। নিজেদের সম্পদ উত্তোলনের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নেয়নি নিকট অতীত রাজনৈতিক সরকার? মূলত তারা দেশটিকে পরনির্ভরশীল করে তুলেছে। এখন ওই গহ্বর থেকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে আনা কঠিন হলেও, অসম্ভব নয়। বর্তমান সরকারকে এটা বুঝতে হবে, জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে যদি নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন করে পাইপলাইনে তুলে আনা যায়, তাহলে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা এত কঠিন হবে না। আমরা সরকারকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। বিদ্যমান গ্যাস ও তেল কূপগুলো থেকে কী পরিমাণ গ্যাস-তেল মিলবে সেটা যাচাই করার পাশাপাশি অনশোর ও অফশোরে থাকা ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান তৎপরতা চালানো জরুরি।
পেট্রোবাংলার একটি প্রতিষ্ঠান বাপেক্স অনশোর ও অফশোর কূপ খননের উদ্যোগ নিতে পারে। এর আগে যেসব কূপে গ্যাস মিলেছে, সেই সম্পদ উত্তোলনের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে, টেংরাটিলার গ্যাসকূপ নতুন করে খনন করা হোক। সেখানে বিপুল মজুদ আছে। বিদেশি যে কোম্পানি টেংরাটিলাকে আগুনের হাতে সোপর্দ করেছিল, আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করেছে। সেই অর্থ দিয়ে টেংরাটিলায় পুনরায় খনন করা যেতে পারে। বঙ্গোপসাগরের ক্ষেত্রগুলোতে দেশি-বিদেশি গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননের জোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। দেশের সম্পদ যদি আমাদের উৎপাদন সেক্টরে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে লাভ আমাদের। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অন্যায় যুদ্ধের অবতারণা যাতে না হয়, বিশ্বশান্তির পক্ষে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। আমরা কি গ্যাস-বিদ্যুতের বহুমুখী প্রকল্পগুলো নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ভুলে যাব। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌর ও অন্য উপায়গুলো সচল করা যেতে পারে। একমুখী নির্ভরতা না রেখে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুমুখিনতা প্রত্যাশা করি।