হাসনাতকে স্পিকার

এটা শাহবাগ নয় পার্লামেন্ট, অসহিষ্ণু হলে চলবে না

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বিল সংশোধিত আকারে পাস হওয়া কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমঝোতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ এনে জাতীয় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে বিরোধী দল। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন। ওয়াকআউটের আগে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজ আমরা দুঃখ নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।’

গতকাল মাগরিবের বিরতির আগে বিলটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি হুবহু অনুমোদনের সুপারিশ করলেও, সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়েএমন তিনটি সংশোধনী এনে বিলটি পাস করা হয়। এ নিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রতিবাদ জানালে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

স্পিকারের বক্তব্যের সময় কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ দাঁড়িয়ে হইচই করলে স্পিকার বলেন, মাননীয় সদস্যবৃন্দ এটি নিয়ে ৯০টি বিল পাস করা হয়েছে, একটি মাত্র বিল বাকি আছে এবং এই বিলগুলো পাস করার ক্ষেত্রে সরকারি দল এবং বিরোধী দল যে চমৎকার সমঝোতা দেখিয়েছেনএটি সংসদীয় ইতিহাসে বিরল। এর আগের ছয়টি সংসদ দেখেছি। এত সুন্দর পরিবেশ, সহযোগিতামূলক পরিবেশ আগে কোনো সংসদে ছিল না। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী যে কথাটি বললেন, আপনাদের আপত্তি প্রয়োজন হলে এটারও তো একটা রেমিডি আছে। এ বিষয়টি নিয়ে এত অসহিষ্ণু হলে চলবে না মিস্টার আব্দুল্লাহ, দিস ইজ নট শাহবাগ স্কয়ার, দিস ইজ পার্লামেন্ট। এখানে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে, শুনতে হবে। নোটিস দেবেন, উইল অ্যাডজুকিটেড অন দি নোটিসেস। আইনমন্ত্রী যে কথাটি বলেছেন, এটি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। আপনারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে পরবর্তী অধিবেশনে সংশোধনী বিল আনেন। সেটি নিশ্চয়ই সরকারি দল বিবেচনা করবে।

স্পিকারের এ মন্তব্যের পর সংসদে জোরে চিৎকার-চেচামেচি শোনা যায়। এর মধ্যে স্পিকার কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘এখানে (সংসদে) মৌখিক কথা বলার স্কোপ খুবই কম। নোটিস দেবেন। আমরা তা আমলে নেব।

আলোচনার সূত্রপাত হয় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ নিয়ে। মাগরিবের বিরতির পর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিশেষ কমিটিতে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পাসের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু বিলটি পাসের মাত্র ৩০ মিনিট আগে রহস্যজনকভাবে একটি সংশোধনী আনা হয়। সংশোধনীতে জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হিসেবে বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে সংস্কৃতিমন্ত্রীকে রাখার প্রস্তাব করা হয়। এটি সরাসরি দলীয়করণের প্রতিফলন। আমরা চেয়েছিলাম সাহিত্য, ইতিহাস ও জাদুঘর বিশেষজ্ঞরা এটি পরিচালনা করবেন। এভাবে শেষ মুহূর্তে সমঝোতা ভেঙে সংশোধনী আনা রাজনৈতিক জোচ্চুরি।

জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, এ সংশোধনী সরকার আনেনি, এটি একজন বেসরকারি সদস্যের (আনিসুর রহমান) প্রস্তাব। আর পর্ষদের প্রধান হিসেবে মন্ত্রী থাকা একটি সাধারণ রেওয়াজএটি দলীয়করণ নয়।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে কোনো সদস্য সংশোধনী আনতে পারেন। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে পর্ষদের কেউ দুর্নীতি বা জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিটবিরোধী কাজ করলে তাকে অপসারণ করা যায়। পরে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের এ অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আলোচনা ছাড়া শেষ মুহূর্তে সংশোধনী আনলে আস্থার সংকট তৈরি হয়। আজ (শুক্রবার) রাত ১২টার মধ্যে অধ্যাদেশগুলো বিল হিসেবে পাস না হলে সেগুলো তামাদি হয়ে যাবে। আপনারা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ (দুদক, মানবাধিকার কমিশন, তামাক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) আটকে রেখেছেন কেন?’

জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনসহ ১৬টি অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার জন্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এগুলো পরে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করেই আনা হবে।

আইনমন্ত্রীর আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিরোধী দল। বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান সমঝোতাই যদি রক্ষা না হয়, তবে ভবিষ্যতে আলোচনার আশ্বাস অর্থহীন। দাবির প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি এই অভিযোগ তুলে তিনি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘোষণা দেন।

এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সব স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস এখানে সংরক্ষিত থাকবে। এটি কোনো দলের নয়, এটি জাতির সম্পদ। তখনো বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আপত্তি জানাতে থাকেন।

এ পর্যায়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, অধ্যাদেশগুলো আগামী অধিবেশনেই উত্থাপন করা হবে। এরপরও বিরোধী দলের নেতাসহ সদস্যরা দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্পিকার বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, চিফ হুইপের আশ্বাসের ওপর তো আস্থা রাখতে পারেন। নাকি ওয়াকআউট করার দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। পরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বেঁচে থাকলে পরবর্তী সেশনে বিল এলে আবার দেখা হবে। এরপর তারা ওয়াকআউট করেন। তারপর আরেকটি বিল পাসের পর অধিবেশন আগামী বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত