কড়া নিরাপত্তা প্রহরায় পীর শামীমের দাফন সম্পন্ন, ২৪ ঘণ্টা পরও হয়নি মামলা

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং দরবারের মধ্যমনি পীর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুবৃত্তরা। আজ রবিবার লাশের ময়নাতদন্ত শেষে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা প্রহরায় স্থানীয় কবরস্থানে লাশ দাফন সম্পন্ন হয়। এ ঘটনায় এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা।

গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’ নামে পরিচিত আস্তানায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আস্তানার আরও তিন ভক্ত মহন আলী, জামিরুন ও জুবায়ের গুরুতর আহত হন।

এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল দেখেছেন।

রবিবার দুপুর আড়াইটায় লাশ ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরেও সংশ্লিষ্ট দৌলতপুর থানায় কোনও মামলা হয়নি। এ ঘটনায় জড়িত কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ। নিহত পীরের লাশ আস্তানা সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে। লাশ দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আলাপ আলোচনা সাপেক্ষে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান।

এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনও পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। প্রশাসনের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে তারা হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দরবারের দলবার হলসহ বিভিন্ন স্থানে। খবর পেয়ে ভেড়ামারা ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে হামলার শুরু থেকেই ঘটনাস্থলে দৌলতপুর থানা পুলিশের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

নিহত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার পরিবার ও ভক্ত অনুসারী সূত্রে জানা যায়, শামীম ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় এই আস্তানা গড়ে তোলেন। তিনি নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে কিছুদিন ঢাকায় চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক ধর্ম চর্চায় নিজেকে যুক্ত করেন। ২০২১ সালের মে সাসের দিকে তার দরবারে এক শিশুর লাশ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় এই পীর আলোচনায় উঠে আসেন। সে বছরই তার আর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। পরে ভিডিওর সূত্র ধরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে এক হেফাজতে ইসলামের নেতা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। মামলায় তিনি বেশ কিছুদিন করাবাস করে জামিনে মুক্তি পান। সেই একই ভিডিও হঠাৎ করে গত দুইদিন আগে কে বা কারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এলাকার সাধারণ লোকজনকে উত্তেজিত করে তোলে। এই হামলা একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে করেছে তারা।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়ে আক্রান্ত শামীমকে উদ্ধার করার চেষ্টাও করেন। কিন্তু সেখানে হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নিজ ঘরে তাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শনাক্তের কাজ করছে পুলিশ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, কে পীর কে বাউল কে ফকির কোথায় কিভাবে ধর্ম অবমাননা করল সেটা দেখার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসন আছে। আইন আছে, বিচার আছে। কারো কোনও আপত্তি থাকলে বা সংক্ষুব্ধ হলে তার জন্য বিচার বিভাগ আছে। তাই বলে এভাবে তাণ্ডব চালিয়ে মানুষ হত্যার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। আমি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেছি- ‘ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত জড়িত থাক না কেন তাদের সনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত