অনাদায়ী শিল্পঋণ ব্যাংক খাতের আতঙ্ক

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০২ এএম

শিল্প খাতের মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিল্পে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন চরম আতঙ্কে ভুগছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি বলছে, শিল্প ঋণের পাশাপাশি এসএমই উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫ দশমিক ৪৩ শতাংশও সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তা এখন খেলাপি হয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার ঢাকা চেম্বার আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয় : ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় উপস্থাপিত মূল বক্তব্যে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

মূল বক্তব্যে বলা হয়, ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই। বরং রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তারপরও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। যা আগের বছরের ৭ দশমিক ১৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ খাতের টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি বলে তুলে ধরা হয়।

তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশের অভাবে শিল্প খাতে উৎপাদন হ্রাস, বকেয়া ঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্প খাত মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং সময় অতিবাহিত করছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের আর্থিক খাতের দুরবস্থার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত রয়েছি। তবে এ অবস্থা উত্তরণে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন, সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ঋণব্যবস্থা প্রতর্বনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ইতিমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

উপদেষ্টা বলেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশে মানুষের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট লাঘব হয়, সেই বিষয়টিকে বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। ফলে জ¦ালানি তেলের মূল্য এখনও বাড়ানো হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্রো ইকোনোমিক স্ট্যাবিলিটি না থাকার কারণে বেসরকারি খাতে চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এজন্য ব্যবসা পরিচালনা সূচকে উন্নয়নের ওপর জোরারোপ করেন। মূল্যস্ফীতিকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসএমই ফাইন্যান্সিং সহজীকরণ করার কোনো বিকল্প নেই এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে। এ ছাড়া সরকারের নীতি নির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যার নিরসন প্রয়োজন।

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলো প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের এ ধরনের ব্যবসায় এগিয়ে আসতে হবে। এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে তাদের ঋণ প্রদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা তিনি।

সিটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, আগামী বছর খেকে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে ব্যাংক খাতে ঋণের অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার সুযোগ কমবে। ফলে বাড়বে খেলাপি ঋণ, সেই সঙ্গে কমবে ব্যাংকের সক্ষমতা। এর জন্য প্রস্তুতি দরকার।

তিনি জানান, এসএমইদের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রদত্ত ক্রেডিট গ্যারিন্টি স্কিমের সীমা বাড়ানো এবং ঋণ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় তথ্যাদির সংখ্যা সীমিতকরণ জরুরি। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি মার্কেট প্লেস খুবই আবশ্যক। তা না হলে উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত