অন্তর্বর্তী সরকারের একটি মাত্র সিদ্ধান্ত। আর তাতে ধস নেমেছে স্বাস্থ্য খাতে। জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাত এক প্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। সামনে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে আরও ভয়াবহ আকার ধারণের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। শঙ্কা রয়েছে ডিপথেরিয়া, টিভি, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশির প্রাদুর্ভাবের। তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। টিকা কার্যক্রমে ভাটা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের বেতন বন্ধ সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অবৈজ্ঞানিক ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। যার নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান এবং ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হতে পারে। এই থমকে যাওয়া খাতে গতি ফেরাতে এখন বর্তমান সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আগে টিকা কেনা হতো ইউনিসেফ থেকে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ইউনিসেফ এবং ৫০ শতাংশ কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ কারণে টিকা কেনায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সব ধরনের টিকার সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট এখনো বিদ্যমান। তবে বর্তমান সরকার তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, যে টিকাগুলো সরকারের কাছে থাকার কথা সেগুলো গত ১৬ মার্চ থেকে শেষ হওয়া শুরু করেছে। এপ্রিলে পেন্টাভ্যাক্স এমএম; ডিপথেরিয়া, পারটুসিস (হুপিংকাশি) এবং টিটেনাসসহ সবই মোটামুটি শেষ হওয়ার পথে। এই সংকটের সমাধানে সরকার নতুন করে টিকা কেনার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সরকার সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনতে তাদের কাছে টাকাও পাঠিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শিগগিরই টিকার সমাধান হবে। তবে ওপি চালু করতে না পারলে সংকট থেকে যাবে।
টিকা শেষ হওয়া প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল। অদ্ভুত ঘটনা হচ্ছে, আগে সরকার সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা কিনত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, ৫০ শতাংশ কিনবে ইউনিসেফের থেকে আর বাকি ৫০ শতাংশ সিএমএসডিতে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে। ওপেন টেন্ডার করা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে বিষয়টি ঝুলে ছিল। বর্তমান সরকার এখন সরাসরি প্রকিউরমেন্টে নিয়ে আসায় ইউনিসেফ থেকেই কেনা হচ্ছে। বাকি ৫০ শতাংশের টাকার জন্য একটা সমন্বয়ের বিষয় ছিল। কোভিডের কিছু টাকা বেচেছিল। সেই টাকার সঙ্গে সমন্বয় করতে সময় লাগছিল। সেটাও এখন মোটামুটি সমাধান হয়েছে। সুতরাং এখন নতুন ভ্যাকসিন পেতে আর সমস্যা নেই। তবে টিকার যে সংকট সেটা ডিপোতে, ডিস্ট্রিবিউশন এরিয়া, বিভিন্ন উপজেলা-জেলায় এখনো টিকা আছে। সেগুলো দিয়ে সর্বোচ্চ ১৫-২০ দিন চলবে। ২০ তারিখ থেকে আমরা রেগুলার ভ্যাক্সিনেশন শুরু করছি। আর সমস্যা হবে না।’
জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে অপারেশন প্ল্যানে (ওপি) স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যার কার্যক্রমগুলো চলছিল। তা নবায়ন না করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব (স্বাস্থ্য-৩) ফাতিমা-তুজ-জোহরা ঠাকুর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ওপি পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত তিন পদবিও বিলুপ্ত করা হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ওপিতে ৫ বছর মেয়াদি খাতভিত্তিক ব্যাপক কর্মসূচি পরিচালিত হতো। প্রায় ৩৪-৩৫টি ওপি দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সব কাজ হতো। স্বাস্থ্যের সব কাজ যেমন কিউরেটিভ সার্ভিসেস, হাসপাতাল, হাসপাতালের ওষুধপত্র, নানা সার্জিক্যাল জিনিস, যন্ত্রপাতি কেনা এবং হাসপাতালের যত কর্মকা- আছে সবই ওপির মাধ্যমে হতো। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের কাজগুলো, যেমন টিকা দান, কুকুর এবং মানুষকে জলাতঙ্কের টিকাদান। এভাবে বিভিন্ন রোগ নির্মূল, বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে কাজ করত এই ওপি। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ওপি বন্ধ করে দেয়। আর এতে স্বাস্থ্য সেবার বিভিন্ন বিষয় স্থবির হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘এখানে দুটি জিনিস ছিল। একটি ছিল বাজেট, যেটা পাঁচ বছরের জন্য ছিল। কাজেই পাঁচ বছর ধরে কাজটা এগিয়ে নেওয়া যেত। তাতে কাজের ধারাবাহিকতা থাকত এবং তার একটা ইমপ্যাক্ট থাকত, স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে কিন্তু অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। যেমন টিকায় বিশ্বের অন্যতম ভালো দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। বেশ কয়েকটা রোগ নির্মূল; যেমন শিশুদের ধনুষ্টংকার নির্মূল, পলিও নির্মূল, কালাজ¦র নির্মূল, গোদ রোগ নির্মূল হয়েছে। তাহলে চিন্তা করে দেখুন যে একটা সিস্টেমের মাধ্যমে কত বিশাল অর্জন হয়েছে। সেই ওপি যখন বন্ধ করা হলো, তার বিকল্প কিন্তু কিছু করা হলো না।’
অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার হলো, তাদের সময় ধরতে গেলে অর্থপ্রবাহ শূন্যের কাছে চলে আসে। সব মিলিয়ে আমাদের জনস্বাস্থ্য ভীষণ হুমকিতে পড়ে। একদিকে বাজেট ছিল না, অন্যদিকে টিকাদান কর্মী, স্বাস্থ্য সহকারীদের বিভিন্ন আন্দোলন টিকা প্রয়োগকে কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
ওপি না থাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ সাল থেকে আমরা হাম নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। কিন্তু গত এক বছর টিকা না দেওয়ায় পরিস্থিতি কোন অবস্থায় গেল? এখান থেকে স্পষ্ট ওপি না থাকায়, জনস্বাস্থ্যবান্ধব কর্মসূচিগুলো না থাকায় আমাদের সামনে আরও অনেক ভোগান্তি আছে। ডিপথেরিয়ায়, টিবি, ধনুষ্টংকার, হুপিংকাশি এ রকম প্রতিরোধযোগ্য যতগুলো রোগ আছে, সবগুলোর ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
মানুষের টিকা শুধু নয়; কুকুরের টিকাও দেওয়া হচ্ছে না দীর্ঘদিন। এতে জলাতঙ্কের ঝুঁকি বাড়ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জলাতঙ্কে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে মৃত্যু হয় ১৯ জনের।
এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) বাইকে কর্মস্থলে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু তাদের অনেককেই বাইকে কর্মস্থলে যেতে হয়। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার গাড়ির তেল খরচ ও চালকের বেতন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে জন্য তাদের কখনো ভাড়ার বাইকে, কখনো অন্য যানবাহনে চড়ে উপজেলার স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকি করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান এ বিষয়ে বলেন, ‘ফিল্ড লেভেলের যারা সামান্য বেতনের কর্মচারী তারা রেমুনারেশন পাচ্ছেন না, টাকা পাচ্ছেন না। তাহলে কেন কাজ করবেন? উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সেও গাড়িচালকদের বেতন, মেসিয়ার, ক্লিনার, মালী, ওয়ার্ড বয়, আয়া, সুইপার কারোরই বেতন হচ্ছে না।’ কতটা অমানবিক বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে পুরোপুরি ধস নেমেছে। এখন এই যে কার্যক্রমগুলো স্বাস্থ্য খাত চলছে, তা শুধু মানবিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইপিআই এবং স্বাস্থ্যসেবার যা কিছু তার পুরো নিয়ন্ত্রণ উপজেলা হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হাতে। তাদের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, তাদের কোনো টাকা নেই, তাদের টাকা খরচের কোনো জায়গা নেই, তারা কোনো কিছুই করতে পারছেন না। এভাবে যদি চলতে থাকে, আমরা যদি এই ওপির বিকল্প না করতে পারি, এটা আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে ভয়ংকর আকার ধারণ করবে।’
একটি ভ্যাকসিনের ক্যারিয়ারের ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা বহনে ফান্ডিং নেই। ওপি বন্ধ করে দেওয়ায় এখন এই বাক্স কে কাঁধে করে নিয়ে যাবে? তারপরও কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের লোকরা নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এই যে ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রামটা চালু করছি, তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বসেছিলাম। তারা কথা দিয়েছেন, কাজ বন্ধ করবেন না। তাই তাদের বিষয়টিও সরকারকে দেখতে হবে।’
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘একদিকে শিশুদের টিকার সংকট, অন্যদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর। সাপের কামড়ের প্রতিষেধক এন্টিস্নেক ভেনম, জলাতঙ্কের টিকাসহ অন্তত ১০ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সংকট রয়েছে। সেই সংকটে আমরা এক সময় সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার বাড়তে দেখেছি। মানুষ এন্টি র্যাবিস ভ্যাকসিনের জন্য দোকানের পর দোকান খুঁজে বেরিয়েছে, পায়নি। বাচ্চাদের টিকা দানের হার ছিল প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ। সেটা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘এক সময় মাতৃমৃত্যুর হার কমে গিয়েছিল। শিশু মৃত্যুর হার কমে গিয়েছিল। সেই সব জায়গায় এখন কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি হারগুলো ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী। অন্তর্বর্তী সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে হয়েছে। ইতিমধ্যে তার অনেকগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি। আবার বেশ কিছু হয়তো সামনে প্রকাশ ঘটবে। প্রত্যাশা করব সরকার একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি দেখবে এবং কারও অবহেলা থাকলে জবাবদিহিতায় আনবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী বলেন, ‘ওপি পুনরুজ্জীবিত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। হাম নিয়ন্ত্রণে আনার পর এই বিষয়গুলোতে হাত দেওয়া হবে। সবাইকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা হচ্ছে। আগামী ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসবেন। আশা করছি আমরা পারব।’
