জাগো আলোক-লগনে

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৪ এএম

শঙ্কা, অসহিষ্ণুতা ও বৈশি^ক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে শঙ্কামুক্ত জীবন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির প্রত্যাশাকে সামনে রেখে রাজধানীর রমনার বটমূলে সংগীত, কবিতা ও সংস্কৃতির সম্মিলনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ প্রভাতি অনুষ্ঠান নতুন বছরের সূচনালগ্নে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা, ঐতিহ্য ও মানবিক মূল্যবোধকে আবারও জাগ্রত করেছে।

বাংলা নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে পূর্ব আকাশের রক্তিম আভা আর মেঘলা আলো-আঁধারির আবহে শতাধিক শিল্পীর সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে সৃষ্ট এই গান নতুন দিনের সূচনা ও আলোর প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে ওঠে। এতে কণ্ঠ মেলান মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ^র্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্ত দেব ও সমুদ্র শুভমসহ অন্য শিল্পীরা।

১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পহেলা বৈশাখে এই প্রভাতি আয়োজন করে আসা ছায়ানট এবারও আয়োজন করে সুর, কবিতা ও ভাবগভীর উপস্থাপনায় ভরপুর একটি অনুষ্ঠান। ভোর থেকেই রমনার বটমূল প্রাঙ্গণে জড়ো হতে থাকেন দর্শনার্থীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি, একপর্যায়ে বটমূল ছাড়িয়ে রমনা পার্কজুড়েই ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ঢল। লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে সজ্জিত নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক বিশাল সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।

পুরো অনুষ্ঠানে ছিল সম্মেলক গান আটটি, একক কণ্ঠের গান ১৪টি এবং কবিতা পাঠ দুইটি। সব মিলিয়ে ২৪টি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাজানো হয় নতুন বছরের এই ডালি। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে মূল অনুষ্ঠানের।

সম্মেলক গানের পর একে একে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকগান ও পল্লীগীতি। ‘এ কি সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার অন্তরা, ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো’ গানটি শোনান আজিজুর রহমান। সেমন্তী মঞ্জুরীর কণ্ঠে ‘বাজাও আমারে বাজাও’, বিটু কুমার শীলের কণ্ঠে ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’, শ্রাবন্তী ধরের কণ্ঠে ‘আজি গাও মহাগীত’ এবং চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে লালনের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গান পরিবেশিত হয়।

এ ছাড়া সম্মেলক কণ্ঠে ‘এসো মুক্ত করো’, ‘সেদিন আর কত দূরে’, ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’সহ বিভিন্ন গান পরিবেশিত হয়, যেখানে সামাজিক দায়বদ্ধতা, মুক্তচিন্তা ও মানবিক চেতনার আহ্বান উঠে আসে। ছোটদের দল পরিবেশন করে ‘অলস হইওনা ভাই’ গানটি। সংগীতের পাশাপাশি ছিল কবিতা। সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ। জাতীয় সংগীত ও কথনসহ মোট ২৪টি গান ও কবিতার মধ্য দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার এ আয়োজন এগিয়ে চলে।

প্রায় ২০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে সংগীত ও কবিতার এই ধারাবাহিক পরিবেশনা যেন প্রজন্মের ব্যবধান ঘুচিয়ে এক সাংস্কৃতিক ঐক্যের বন্ধন তৈরি করে। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে প্রবীণ সবাই মিলে উপভোগ করেন এই আয়োজন। অনেকের গালে ছিল ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’ লেখা আলপনা, আর বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানকে করে তোলে আরও বর্ণময়।

দর্শনার্থীদের মধ্যেও ছিল উৎসবের আমেজ। পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেন অনেকে। আয়োজনে অংশ নেওয়া সুবর্না আক্তার বলেন, দীর্ঘ তিন বছর পর তিনি ছায়ানটের এই আয়োজন দেখতে এসেছেন এবং পুরো আয়োজন তার কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য মনে হয়েছে।

অন্যদিকে প্রথম বারের মতো ছায়ানটের আয়োজনে আসা দম্পতি সালমা-আতিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, এমন পরিবেশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বাংলার শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে পহেলা বৈশাখের আয়োজন তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। বিজিবি, পুলিশ, সোয়াত, র‌্যাব, এপিবিএন ও ডিবির সদস্যরা পুরো অনুষ্ঠানস্থলে দায়িত্ব পালন করেন।

আয়োজনের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী। তিনি বলেন, বর্তমান বিশে^ সহিংসতা, নিপীড়ন ও অস্থিরতার কারণে মানুষ আতঙ্কিত। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে সবার প্রত্যাশা-একটি শঙ্কামুক্ত সমাজ, যেখানে মানুষ নির্ভয়ে মতপ্রকাশ করতে পারবে, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা নির্বিঘœ হবে এবং বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গর্বিত হয়ে বাঁচতে পারবে। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালির জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধারণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

দীর্ঘ এই আয়োজনের পর সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। তবে সংগীত, কবিতা ও মানবমুক্তির বার্তায় ভরপুর এই আয়োজন নতুন বছরের শুরুতেই বাঙালির মনে এক গভীর সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত