১ দোয়ায় উভয় জগতে সফলতার রূপরেখা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৯ এএম

মানবজীবন এক চলমান সফর। এই সফরে মানুষ চায় সঠিক পথ, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বস্তি। কিন্তু কোন জিনিসগুলো সত্যিই মানুষের জীবনে সফলতা এনে দেয়? এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত ও গভীর ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর পাওয়া যায় একটি মহান দোয়ায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এভাবে দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুকা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা’। অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং সচ্ছলতা কামনা করছি। (সহিহ মুসলিম ২৭২১)

এই ছোট দোয়াটি চারটি শব্দে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের পূর্ণ সফলতার রূপরেখা তুলে ধরে। প্রতিটি শব্দের তাৎপর্য বিশদভাবে উল্লেখ করা হলো।

এক. হেদায়েত : ‘হুদা’ অর্থ হেদায়েত বা সঠিক পথপ্রাপ্তি। মানুষের জীবনে জ্ঞান থাকতে পারে, বুদ্ধি থাকতে পারে, অভিজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়েত না থাকলে সে প্রকৃত সত্যে পৌঁছাতে পারে না। হেদায়েত মানে প্রতিটি কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তওফিক। কখন কথা বলতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে, কোথায় খরচ করতে হবে, কোথায় বিরত থাকতে হবে, এ সবই হেদায়েতের অংশ।

পবিত্র কোরআনের শুরুতেই আমরা দোয়া করি, ‘আমাদের সরল পথ দেখান।’ অর্থাৎ একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো সঠিক পথ। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে যখন নিয়মিত এই দোয়া করতেন, তখন বোঝা যায় হেদায়েতের প্রয়োজন সারা জীবনের। হেদায়েত মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচায়, সন্দেহ থেকে মুক্তি দেয় এবং অন্তরে প্রশান্তি আনে।

দুই. তাকওয়া : ‘তুকা’ অর্থ তাকওয়া। তাকওয়া হলো অন্তরের এমন এক অবস্থা, যা মানুষকে মহান আল্লাহর অসন্তোষজনক কাজ থেকে বিরত রাখে এবং তার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। তাকওয়া শুধু ভয় নয়, বরং এটি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও জবাবদিহির অনুভূতি। একজন মুত্তাকি ব্যক্তি একা থাকলেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, কারণ সে জানে মহান আল্লাহ তাকে দেখছেন।

সমাজে অনেক আইন-কানুন আছে, কিন্তু মানুষের ভেতরে তাকওয়া না থাকলে সে সুযোগ পেলে অন্যায় করবেই। তাই তাকওয়া হলো আত্মার প্রহরী। এই দোয়ায় হেদায়েতের পর তাকওয়া চাওয়া হয়েছে, কারণ সঠিক পথ জানা যথেষ্ট নয়, বরং সেই পথে টিকে থাকার শক্তিও প্রয়োজন।

তিন. আফাফ : ‘আফাফ’ অর্থ সংযম ও পবিত্রতা। এটি এমন এক গুণ, যা মানুষকে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে রাখে। বর্তমান যুগে চারিত্রিক পবিত্রতা বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়। চোখ, কান ও হৃদয়ের হেফাজত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, আল্লাহর কাছে সংযম ও পবিত্র থাকার দোয়া করতে হবে।

আফাফ মানে শুধু শারীরিক পবিত্রতা নয়, বরং চিন্তা, দৃষ্টি, ভাষা ও আচরণের পবিত্রতা। একজন পবিত্র চরিত্রের মানুষ সমাজে সম্মানিত হন, পরিবারে নিরাপত্তা আনেন এবং নিজের আত্মাকে কলুষমুক্ত রাখেন। চারিত্রিক পবিত্রতা ছাড়া ইবাদতও পূর্ণতা পায় না। তাই এই দোয়ায় তাকওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আফাফের আবেদন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

চার. গিনা : ‘গিনা’ শব্দের অর্থ সচ্ছলতা বা অভাবমুক্তি। তবে এখানে কেবল ধন-সম্পদের প্রাচুর্য বোঝানো হয়নি, বরং অন্তরের প্রাচুর্যও বোঝানো হয়েছে। অনেক ধনী ব্যক্তি অন্তরে অশান্ত, আবার অনেক গরিব ব্যক্তি তৃপ্ত ও সুখী। প্রকৃত গিনা হলো অন্তরের সন্তুষ্টি, যা মানুষকে লোভ, হিংসা ও অতৃপ্তি থেকে মুক্ত রাখে।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত সম্পদ হলো অন্তরের সম্পদ। তাই এই দোয়ায় আমরা শুধু অর্থ নয়, বরং এমন মন চাই যা আল্লাহর দেওয়া রিজিকে সন্তুষ্ট থাকে। গিনা মানুষকে হাত পাতা থেকে রক্ষা করে, আত্মমর্যাদা বজায় রাখে এবং অন্যকে সাহায্য করার শক্তি দেয়।

দোয়াটির সামগ্রিক তাৎপর্য : দোয়ার এই চারটি শব্দ হেদায়েত, তাকওয়া, আফাফ ও গিনা, মানবজীবনের চারটি স্তম্ভের মতো। হেদায়েত ঠিক করে দেয় পথ। তাকওয়া সেই পথে চলার প্রেরণা দেয়। আফাফ চরিত্রকে রক্ষা করে। গিনা অন্তরকে তৃপ্ত রাখে।

এ যেন দ্বীন ও দুনিয়ার পূর্ণ প্যাকেজ। এখানে ইবাদত আছে, নৈতিকতা আছে, আত্মিক শক্তি আছে এবং জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্যও আছে। যদি একজন মানুষ সত্যিই এই চারটি গুণ অর্জন করতে পারে, তবে সে দুনিয়াতে শান্তি ও আখেরাতে মুক্তি লাভ করবে।

আমাদের জীবনে এ দোয়ার প্রয়োগ : এক. প্রতিদিন নামাজের পর এই দোয়াটি পড়া। দুই. শুধু মুখে নয়, অর্থ বুঝে হৃদয় দিয়ে দোয়া করা। তিন. নিজের জীবনে চারটি গুণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। চার. সন্তানদের এ দোয়া শেখানো। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন বিভ্রান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে, তখন এই দোয়া আমাদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়।

আলোকিত জীবন : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের যে দোয়াগুলো শিখিয়েছেন, সেগুলো কেবল শব্দ নয়, জীবনের দিকনির্দেশনা। মুসলিম শরিফে বর্ণিত এই দোয়াটি সেটার উজ্জ্বল উদাহরণ। চারটি ছোট শব্দে জীবনের বড় চাহিদাগুলো প্রকাশ পেয়েছে। আমরা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও সচ্ছলতা চাই এবং সে অনুযায়ী জীবন গড়ি, তবে আমাদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন আলোকিত হবে।

আসুন, আমরা এই দোয়াকে জীবনের সঙ্গী বানাই। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ দোয়ার বাস্তব ফল ভোগ করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত