আর্নেস্ট হেমিংওয়ে একবার বলেছিলেন, ‘আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যের উৎস হলো মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিন বইটি।’ এ থেকে ধারণা করা যায়, হেমিংওয়ে ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত ছিলেন, যদিও তার খ্যাতি ‘বুদ্ধিজীবী-বিরোধী’ শৈলীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তিনি আসলে ধ্রুপদি সাহিত্য থেকে শুরু করে আধুনিক আঁভাগার্দ সাহিত্য পর্যন্ত সবকিছুরই একনিষ্ঠ ছাত্র ছিলেন। হেমিংওয়ে লেখালেখি ছাড়া অন্য কিছুর চেয়ে পড়তে বেশি পছন্দ করতেন।
হেমিংওয়ে ছিলেন সর্বগ্রাসী পাঠক। লিখতে শেখার জন্য বই পড়তেন; পড়া আর পড়া। তার পঠনপাঠনের হদিস নিলে দেখা যায়, স্বশিক্ষিত পাঠক ছিলেন তিনি। পড়তেন নিজের ইচ্ছে অনুসারে। সংগ্রহে ছিল প্রায় পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজারের মতো বই। এর বাইরেও বই ধার নিয়ে পড়েছেন।
তার কিওয়েস্টের বাড়ি, কিউবার ফিনকাভিগিয়া, আইডাহোর কেচামবাড়ি, ব্রস্টনের কেনেডি লাইব্রেরি এবং ব্যক্তিগত লাইব্রেরির শেলফে পাওয়া বইয়ের তালিকা থেকে ধারণা করা হয়, তিনি প্রচুর পড়তেন। ভাই-বোনদের স্মৃতিচারণ থেকেও তার পাঠাভ্যাসের হদিস পাওয়া গেছে। সবার বড় মার্সেলানি জানিয়েছেন, স্কট, ডিকেন্স, থ্যাকারয়, স্টিভেনসন এবং শেক্সপিয়রের বইগুলো তার শেলফ দখল করে থাকত। বই ও পত্রপত্রিকা ছিল ভাই-বোনদের নিত্যসঙ্গী।
হেমিংওয়ের নিজের শহর ইলিনয়ের ওক পার্কে ১৯০২ সালে একটা পাবলিক লাইব্রেরি চালু হয়। ছুটির মাসগুলোতে লাইব্রেরিটি অনেক দিনের জন্য বই ধার দিত। হেমিংওয়ে এই প্রতিষ্ঠানটির ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধান লাইব্রেরিয়ানকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমি এই লাইব্রেরির কাছে অনেক ঋণী।’ বই পড়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন হেমিংওয়ে। তিনি আজীবন বই পড়ে গেছেন।
হেমিংওয়ের প্রাথমিক সাহিত্যশিক্ষা ঘটেছিল ওক পার্ক হাইস্কুলের ইংরেজি পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। স্কুলের সিলেবাস অনুসারে তার এই শিক্ষার সূচনা ঘটেছিল মূলত ব্রিটিশ লেখক চসার, শেক্সপিয়র, স্পেন্সার, মিল্টন, টেনিসন, শেলি, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং ডিকেন্সের ধ্রুপদি রচনার ওপর ভিত্তি করে। মার্কিন লেখকদের বই তিনি পড়েছেন আরও অনেক পরে। তিনি আমেরিকান লেখকদের খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। তবে মার্ক টোয়েন ও হেনরি জেমসের লেখা তিনি পড়েছিলেন। বিস্ময়কর হলো, তার কথাশিল্পের শৈলী ও কাঠামোর ধরনটি গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ ইউরোপীয় লেখকদের বই পড়ে।
হাইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হেমিংওয়ে ঠিক কী ধরনের বই পড়তেন, সেরকম কোনো তথ্য মেলে না। শিকাগো ও টরন্টো থাকার সময় কী ধরনের বই পড়তেন তা-ও জানা যায়নি। হেমিংওয়ের জীবনীকার কার্লোস বেকার বলেছেন, ওই সময় জোসেফ কনরাড তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ লেখক ছিলেন। যৌনবিজ্ঞানী হ্যাভলক এলিসের ইরোটিক সিম্বলিজম এবং দ্য ড্যান্স অব লাইফ এবং সম্ভবত আনাতোল ফ্রান্সের বেশ কিছু বই তার পাঠ্য তালিকায় ছিল। মাইকেল রেনল্ডস গবেষণা করে দেখেছেন, প্রথম স্ত্রী হ্যাডলির সঙ্গে প্রেম করার সময় তারা দুজনে ইশেরউড অ্যান্ডারসন, বালজাক, কনরাড, হার্ডি, কিপলিং এবং সি. এস. লুইসের বই পড়তেন।
হেমিংওয়ের সাহিত্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন প্যারিসের লেফট ব্যাংক ক্যাফে, শুঁড়িখানা ও বইয়ের দোকানে যাতায়াত ও আড্ডার মধ্য দিয়ে। প্যারিসে আসার পর শিক্ষানবিশ এই লেখক ১৯২৪ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার সাহিত্যিক দীক্ষা শুরু হয় সিলভিয়া বিচের ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের বইয়ের দোকান ও লাইব্রেরির বই পড়ে। এটি তাকে কেবল পড়ার বই-ই দেয়নি, সমকালের সেরা লেখকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছিল। এই রত্নভাণ্ডারের খোঁজ পেয়ে তিনি হ্যাডলিকে লিখেছিলেন, ‘আমাদের পড়ার পৃথিবীর সব বই এখন আমার হাতের নাগালে এবং আমরা যখন ভ্রমণে যাব তখন সেগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারব।’ প্যারিসেই হেমিংওয়ের সঙ্গে এজরা পাউন্ডের দেখা হয়। পাউন্ড তাকে পড়বার জন্য ধ্রুপদি লেখকদের একটা তালিকা দেন। সেই তালিকায় কনফুসিয়াস, হোমার, ওভিড, দান্তে, ভলতেয়ার, স্তাঁদাল ও ফ্লবেয়ারের মতো লেখক ছিলেন।
হেমিংওয়ে এর পাশাপাশি উনিশ শতকের সেরা লেখক, যেমন জয়েস, পাউন্ড, এলিয়ট এবং স্টেইনকেও পড়তে শুরু করেন। টি. এস. এলিয়টের দ্য ওয়েস্টল্যান্ড, জেমস জয়েসের ইউলিসিস এবং সম্ভবত হেনরি জেমসের অধিকাংশ উপন্যাস তখনই তিনি পড়েন। সিলভিয়া বিচ তাকে পরামর্শ দেন, রুশ লেখকদের লেখা পড়তে। অল্প দিনের মধ্যে রুশ লেখকরা তার প্রিয় হয়ে ওঠেন। হেমিংওয়ে তার আ মুভেবল ফিস্ট গ্রন্থে লিখেছেন, শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি থেকে তিনি তুর্গেনেভের আ স্পোর্টসম্যান’স স্কেচেস, ডি. এইচ. লরেন্সের সন্স অ্যান্ড লাভার্স, টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস এবং দস্তয়েভস্কির দ্য গ্যাম্বলার ধার নিয়ে পড়েছিলেন। হেমিংওয়ের পাঠাভ্যাস লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনি নিয়মিত মহৎ সাহিত্যের সান্নিধ্যে থাকতেন। ফ্লবেয়ার, মোপাসাঁ, বালজাক, জোলা, দস্তয়েভস্কি, ইয়েটস এবং নিটশের মতো লেখকের পাশাপাশি আমেরিকান লেখক সিনক্লেয়ার লুইস, স্যান্ডবার্গ এবং ও’নিলও তার পঠন-পাঠনের তালিকায় ছিল।
হেমিংওয়ে কেবল আনন্দ লাভের জন্য পড়তেন না; তিনি এমন বই খুঁজতেন, যা তার নিজের লেখার কাজে সহায়ক হয়। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস লেখার সময় তিনি যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা কয়েকটি বই পড়েছিলেন। এমনকি ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে লেখার সময় তিনি বেশ কিছু বইয়ের সাহায্য নেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পছন্দের বই হিসেবে তিনি টলস্টয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস, ফ্লবেয়ারের মাদাম বোভারি, জয়েসের ইউলিসিস, দস্তয়েভস্কির দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ এবং মার্ক টোয়েনের হাকলবেরি ফিন-এর নাম বলেছেন। প্যারিস রিভিউয়ের সাক্ষাৎকারে বাখ ও মোজার্টের মতো সুরকার এবং সেজান ও ভ্যান গঘের মতো চিত্রশিল্পীদের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, চিত্রশিল্পীদের কাছ থেকেও তিনি বর্ণনা এবং শৈলী সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছেন।
হেমিংওয়ের সঙ্গে সবসময় একটি বইয়ের লাইব্রেরি থাকত। কিউবায় যাওয়ার সময় ২৬ ক্রেট বই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার কিওয়েস্টের বাড়ির মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত উঁচু কয়েকটি বুক শেলফ বইয়ে ঠাসা থাকত। জীবনী, সাহিত্য সমালোচনা, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি এবং গোয়েন্দা গল্প থেকে শুরু করে সব ধরনের বই তার সংগ্রহে ছিল। কিউবার ফিনকাভিগিয়াতে তার সংগ্রহ প্রায় নয় হাজার বইয়ে গিয়ে ঠেকে। বই ছিল হেমিংওয়ের সর্বক্ষণিক সঙ্গী, একমাত্র বন্ধু যাদের জন্য তিনি কখনোই বিরক্ত বোধ করতেন না। তিনি তার প্রিয় লেখকদের প্রতি আজীবন ঋণী ছিলেন। আট বছরে তুর্গেনেভের স্পোর্টসম্যান’স স্কেচেস বইটি চারবার সংগ্রহ করেছেন।
হেমিংওয়ের জীবন ছিল ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মতো। এটা ছিল তার আজীবনের অভ্যাস। তার কাছে বইয়ে ঠাসা একটা ডাফেল ব্যাগ থাকত। গ্রিন হিলস অব আফ্রিকাতে তিনি তার এই অভ্যাসের কথা নিজেই লিখে গেছেন, ‘যখন আমি গিরিখাত ধরে এগোচ্ছিলাম, তখন গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে তলস্তয়ের সেভাস্তোপল পড়তে আমার খুব ভালো লাগছিল।’ আফ্রিকার দ্বিতীয় সাফারিতে ভ্রমণ করার সময়েও একই ঘটনা ঘটেছে। তার চতুর্থ স্ত্রী মেরি লিখেছেন, ‘বইয়ে ঠাসা একটা ব্যাগ সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকত।’
হেমিংওয়ের বইয়ের শ্রেণিবিন্যাস করেছেন গবেষক রেনল্ডস। তাতে দেখা যায় তার পাঠের তালিকায় ছিল জীবনী, সাহিত্য, ইতিহাস, সমালোচনা, প্রতিবেদন, ছোটগল্প, কবিতা, সামরিক ইতিহাস, গুপ্তচরবৃত্তি, রহস্য উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, রেফারেন্স ইত্যাদি। রেনল্ডস উপন্যাসের সংখ্যা এই হিসাবের মধ্যে রাখেননি। কারণ সংখ্যায় উপন্যাস এত বেশি ছিল যে সেগুলো শ্রেণিবদ্ধ করা তার কাছে কঠিন মনে হয়েছে।
বই ছিল হেমিংওয়ের চিরসঙ্গী। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে, এক সংসার থেকে অন্য সংসারে, ব্যক্তিগত অন্য কিছুর চাইতে বইকেই তিনি বয়ে নিয়ে গেছেন। এই বই তার লেখকসত্তার সঙ্গে মিশে ছিল। এখন তার সংগৃহীত বইগুলো সংরক্ষিত আছে কিউবা এবং বোস্টনের জন এফ কেনেডি লাইব্রেরিতে। কিছু আছে প্রিন্সটন ও কিওয়েস্টে। জীর্ণ হয়ে যাওয়া এসব বইয়ের পাতায় পাতায় দেখতে পাওয়া যায় তার নিজের হাতে লেখা টীকাভাষ্যগুলো, যা একজন কালজয়ী লেখকের অর্জিত শিক্ষা এবং যশের ইতিহাস বহন করে চলেছে।
