ডা. মারিয়া কিবতিয়ার
শিশু বিশেষজ্ঞ, বিভাগীয় প্রধান
নবজাতক ও শিশু বিভাগ ডিভাইন মারসি হাসপাতাল, ঢাকা।
আমাদের সবার অতি পরিচিত একটি আতঙ্কের নাম ডায়রিয়া। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রায় খাবার ও পানির সহজে দূষণ, পানিশূন্যতা এবং অপরিষ্কার পরিবেশ সব মিলিয়ে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই সময়মতো লক্ষণ চিহ্নিত করা, সঠিকভাবে ওআরএস ও তরল খাবার দেওয়া এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা ও প্রাথমিক চিকিৎসা জানলেই অনেক ক্ষেত্রে ডায়রিয়া থেকে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার প্রকোপ বড়দের থেকে একটু বেশি থাকে কারণ শিশুদের শরীরে বড়দের তুলনায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম। শিশুদের ডায়রিয়ার প্রধান কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে
ডায়রিয়া কী এবং কেন হয়
দিনে ৩ বার বা তার বেশি সংখক পাতলা পায়খানা হওয়াকেই ডায়রিয়া বলে।
বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চারা স্বাভাবিক ভাবেই ৮-১০ বার পায়খানা করতে পারে। পায়খানাটি অনেক সময় সবুজ সবুজ এবং চটচটে হয়। এটিকে ডায়রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না।
৬ মাস থেকে ২ বছরের বাচ্চাদের ডায়রিয়ার প্রধান কারণ ভাইরাল ইনফেকশন। এ ধরনের ডায়রিয়ায় মলের চেয়ে পানির পরিমাণ বেশি থাকে, সঙ্গে বাচ্চার বমি থাকতে পারে।
এছাড়া ব্যাকটেরিয়াল কারণে যে ডায়রিয়া হয় তাতে জ্বর, পেটে ব্যথা এবং মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।
প্যারাসাইটিক ডায়রিয়াতে বাচ্চার মলটি একটু সবুজাভ এবং দুর্গন্ধযুক্ত হয়, সেই সঙ্গে পেটে ব্যথা থাকে।
এছাড়া কোনো খাদ্য হজমে সমস্যা থাকলে অথবা জেনেটিক কিছু সমস্যায় অথবা অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলেও ডায়রিয়া
হতে পারে।
ডায়রিয়ার লক্ষণ
ঘন ঘন পাতলা পায়খানা করা।
পেটে ব্যথা। বমি। জ্বর।
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া।
করণীয়
৬ মাসের নিচের বয়সের বাচ্চার ডায়রিয়া হলে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
৬ মাসের বেশি বয়সের বাচ্চাকে ঘন ঘন, বিশেষ করে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর পরিমাণ মতো ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে। ওরস্যালাইন সঠিক নিয়মানুযায়ী বানাতে হবে। এটি বাচ্চার পানিস্বল্পতা এবং শরীরে লবণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কমাবে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ ঠিক রাখবে।
অন্যান্য পানীয় যেমন ডাবের পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে খাওয়াতে হবে।
বাচ্চাকে কাঁচাকলা রান্না বা সেদ্ধ করে খাওয়াতে হবে।
জিংক সিরাপ বাচ্চার বয়স অনুযায়ী পরিমাণ মতো শুরু করতে হবে।
বাচ্চার বমি হলে অল্প অল্প করে একটু পর পর ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং সেই সঙ্গে বমির জন্য অ্যান্টিইমেটিক সিরাপ শুরু করতে হবে।
বাচ্চা অতিরিক্ত বমি করলে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলে, খিঁচুনি হলে, পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে, পেটে প্রচ- ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিরোধ
বাচ্চাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
প্রতিবার খাবার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে।
বাচ্চার খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে।
৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
২ বছরের বেশি বয়সের বাচ্চাকে ৬ মাস অন্তর অন্তর ক্রিমির ওষুধ খাওয়াতে হবে।
সময়মতো বাচ্চাকে রোটা ভাইরাসের টিকা দিতে হবে।