পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রেজিস্টার সরবরাহে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য এবং আর্থিক দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে জড়িত হিসেবে অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (এমআইএস) মো. তসলিম উদ্দিন খান এবং মো. শাহাদাত হোসাইনসহ (সাবেক পরিচালক) কয়েকজনের নাম এসেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তসলিম উদ্দিন খান এখন আইইএম পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বৈষম্যের শিকার কর্মচারীদের পক্ষে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য শিক্ষা সচিবের বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়। কিন্তু এখনো তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি এখন পরিচালক প্রশাসনের পদে বসারও জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। অভিযোগকারীরা মনে করছেন, মো. তসলিম উদ্দিন খানের ক্ষমতা ও টাকার কাছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। এ নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। রেজিস্টার কেলেঙ্কারি, টেন্ডার বাণিজ্য ও দুর্নীতি তদন্তের জন্য ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রাক্তন যুগ্ম সচিব) মো. আব্দুল্লাহ হারুনকে নিয়োজিত করা হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তিনি তদন্ত করেননি। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি এই কর্মকর্তাকে দুটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ায় তারা বিস্মিত হয়েছেন।
অভিযোগের শুরুতে বলা হয়েছে, ছাত্রজনতার আন্দেলনের পরও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে এর কোনো সুবাতাস বইছে না। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর মো. তসলিম উদ্দিন খানদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে আছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রভাব খাটিয়ে এখন পর্যন্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পরিবার কল্যাণ সহকারী রেজিস্টার (৯ম সংস্করণ), সাপ্লিমেন্টারি রেজিস্টার এবং বিভিন্ন এমআইএস ফরম সরবরাহ সংক্রান্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একটি গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে সব পণ্য গ্রহণ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো অর্থ প্রায় ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ সরবরাহ না হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তসলিম উদ্দিন খান মালামাল গ্রহণের প্রত্যয়ন দেন, যার ভিত্তিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পুরো বিল তুলে নেয়। এতে কয়েক হাজার রেজিস্টার এবং বিপুল সংখ্যক এমআইএস ফরম এখনো সরবরাহ হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৪ জুন নিপুণ প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সঙ্গে ৩০ হাজার পিস পরিবার কল্যাণ সহকারী রেজিস্টার (৯ম সংস্করণ), ১০ হাজার সাপ্লিমেন্টরি রেজিস্টার ও ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৭২ পিস বিভিন্ন ধরনের এমআইএস ফরম সরবরাহ করার জন্য চুক্তি করা হয়। কিন্তু তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালকের (ড্রাগস অ্যান্ড স্টোরস) দায়িত্বে থাকা মো. তসলিম উদ্দিন খানের যোগসাজশে ৩০ জুন অর্থাৎ ছয় দিনের মধ্যে সব মালামাল বুঝে না পেয়েই পুরো বিল পরিশোধ করা হয়। যদিও চুক্তির আট সপ্তাহের মধ্যে সব মালামাল দেওয়ার কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, সব মালামাল গ্রহণ না করেই তসলিম উদ্দিন খান মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মালামাল বুঝে পেয়েছেন বলে প্রত্যয়ন দেন। পরে সব বিল তুলে নেওয়া হয়।
অভিযোগ আছে, এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ পেতে সহযোগিতা করেন উপকরণ ও সরবরাহ ইউনিটের তৎকালীন উপপরিচালক (বৈদেশিক সংগ্রহ) মো. শাহাদাত হোসাইন ও রফিকুল ইসলাম (প্রকিউরমেন্ট কর্মকর্তা)। তারা দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিব ছিলেন। এই টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরও দরদাতা প্রতিষ্ঠান ওহঃবৎমৎধঢ়যরপ ষরসরঃবফ-কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী দেড় কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ওহঃবৎমৎধযরপ এর ১ কোটি ২৯ লাখ টাকার অভিজ্ঞতা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি দেড় কোটি টাকার বিপরীতে মাত্র ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকার আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখিয়েছিল। ফলে মূল্যয়িত সর্বনিম্ন দরদাতা হতে ব্যর্থ হয়।
এদিকে পুরো টাকা বুঝে পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৪৫০০ পিস সহকারী রেজিস্টার (৯ম সংস্করণ), ২৫০০ পিস সাপ্লিমেন্টরি রেজিস্টার ও ৩৯ হাজার পিস এমআইএস ফরম সরবরাহ করেনি। রেজিস্টারগুলো এখনো বুঝে না পাওয়ার বিষয়টি তসলিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক পত্রেও উল্লেখ আছে। এদিকে প্রয়োজনীয় রেজিস্টার না থাকায় ওই সময়ে মাঠ পর্যায়ে অধিদপ্তরের কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়।
এছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। একই অর্থবছরে অটোক্লেভ মেশিন ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকার এই ক্রয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যন্ত্র সরবরাহ না হলেও সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০১৯ সালে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো তা দৃশ্যমান কোনো ফলাফল দেয়নি। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে।
অধিদপ্তরের ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তারা মুখ খুলতে পারেননি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা একটি লিখিত আবেদনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে সুষ্ঠু তদন্ত এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছেও তাদের একই দাবি। তাদের অভিযোগ, অতীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনকালে কেনাকাটা, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট ছিলেন অভিযুক্ত কর্মকর্তা। এছাড়া বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে, যা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।