কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের দরবারে হামলা চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গত ৯ দিনেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। চতুর্মুখী চাপে মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে বাদী পক্ষের আশঙ্কা। যদিও হত্যাকা-ের পর প্রয়াতের স্বজনরা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় মামলা দায়েরেই রাজি ছিলেন না। পরে পুলিশের চাপে মামলা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার না করায় তারা নানাভাবে নিহতের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টিসহ মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সব বিষয়ে পুলিশের গতানুগতিক বক্তব্য ‘তদন্ত চলছে, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে।’
হত্যাকা-ের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সকালের দিকে ‘স্থানীয় গ্রামবাসী’র ব্যানারে পীর হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবিতে মিছিল ও মানববন্ধন করছেন শামীমের ভক্ত-অনুসারীরা। এ ছাড়াও তাদের দাবি শামীম জাহাঙ্গীরের মরদেহ গ্রামের কবরস্থান থেকে তুলে এনে তার নিজের দরবার প্রাঙ্গণে সমাধিস্থ করতে হবে।
অন্যদিকে মামলার এজাহারে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করায় মামলাটিকে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি করে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবিতে পুলিশ প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারা সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ মিছিল, থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে। গত শনিবার বিকেলে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে সংবাদ সম্মেলনে পীরের দরবারে হামলায় ওই সময়ের ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজ প্রদর্শন করা হয়। ওই ভিডিওতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করেন জামায়াত নেতারা। ফুটেজে শনাক্ত হওয়া ওইসব নেতাকর্মীর দলীয় পরিচয়ও প্রকাশ করেন তারা। এই ভিডিও ফুটেজ পুলিশ প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যমে সরবরাহ করেছেন বলে জানান তারা।
উপজেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মামলার পর থেকেই আমরা বারংবার বলে আসছি, ওই দিন ঘটনাস্থলে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকলেও কেবল রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হীন উদ্দেশ্যে এজাহারে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর নাম দেওয়া হয়নি।’
এ বিষয়ে স্থানীয় ফিলিপনগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে হামলাটি সংঘটিত হয়েছে। আমি শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে হামলায় সব বয়সী ছেলেরা অংশ নিয়েছিল। সব দলের লোকই সেখানে ছিল।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে প্রকাশ্যে। ঘটনাস্থলের একাধিক ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। কে ছিল আর কে ছিল না, তা ফুটেজগুলো দেখলেই তো সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।’ পুলিশ তার কাজ ঠিকমতো করলেই এসব বিভ্রান্তিমূলক, উদ্ভট তথ্য কেউ ছড়াতে পারবে না। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার আগে গোটা এলাকার মানুষকে ডেকে কারা জড়ো করেছিল, কারা হামলা করেছেসব তথ্যই প্রশাসন জানে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা নেয়নি।
মামলার প্রধান আসামি উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা, জামায়াত নেতা মোহাম্মদ খাজা আহমেদের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেন, ‘এ রকম একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে সেই আশঙ্কা থেকে আগেই আমি ভেড়ামারা দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেনকে জানিয়েছি। পুলিশকে বলেছি তারা যেন গিয়ে ওই পীর শামীমকে তুলে নিয়ে আসে। কিন্তু পুলিশ তা করেনি। এমনকি ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থেকেও শামীম হত্যাকা- ঠেকাতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘টাইম টু টাইম আমি পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেট করছিলাম। অথচ আমার নামেই মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ।’
এ বিষয়ে ভেড়ামারা-দৌলতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘জামায়াত নেতা খাজা সব জানেন। তিনি পুলিশকে কথা দিয়েছিলেন যে, সেখানে বড় কোনো ঘটনা ঘটবে না। এখন মামলা হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে, যাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের ধরা হবে। পুলিশ কাকে ধরবে আর কাকে ছাড়বে সেটা আইন অনুুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে, কারও কথায় বা চাপে নয়।’
বিএনপি নেতা, স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার দাবি, ‘এই মামলার আসামি যেই হোক তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১১ এপ্রিল বিকেলে পবিত্র ‘কোরআন অবমাননার’ অভিযোগ তুলে একদল লোক কুষ্টিয়া দৌলতপুরে পীরের দরবারে হামলা চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরকে হত্যা করেন। এ ঘটনায় দৌলতপুর থানায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
