চীনের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল ফোশানের অলিগলিতে এখন এক থমথমে পরিবেশ। বিশালাকার সব কারখানার সামনে সস্তায় অস্থায়ী কাজের বিজ্ঞাপনের নিচে জটলা করে দাঁড়িয়ে শ্রমিকরা ধোঁয়া ছাড়ছেন। চেহারায় চরম অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির ছাপ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির অভ্যন্তরে যে চাপা অসন্তোষ আর হাহাকার দানা বাঁধছে, এটি তারই এক ক্ষুদ্র চিত্র।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তার সরাসরি আঘাত এসে লেগেছে চীনের উৎপাদন কেন্দ্রে। সস্তা ও গণ-উৎপাদিত পণ্যের সাম্রাজ্য থেকে চীন এখন অত্যাধুনিক রোবটিক্স ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে মোড় নিচ্ছে। কিন্তু এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্যেই যুদ্ধের অভিঘাত কারখানাগুলোর ক্রয়াদেশ, উৎপাদন ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
ফোশানে মোবাইল ফোন বা প্লাস্টিকের ছাঁচ তৈরির কারখানায় কাজ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনটা যে কেমন, তা কেউ বোঝে না। আমরা শুধু কাজ আর কাজই করি, আমাদের কোনো নিজস্ব জীবন নেই।’ আরেক শ্রমিকের কন্ঠে ঝরে পড়ল আকুতি, ‘দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।’
বর্তমানে এই শিল্পাঞ্চলে প্রতি ঘণ্টা কাজের জন্য দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৮ থেকে ২০ ইউয়ান (প্রায় ৩ ডলার)। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো ও গ্রামে টাকা পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিকের বয়স ৪০ পার হয়ে গেছে, এই বয়সে নতুন করে কাজ খোঁজা বা পেশা বদল করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফোশান থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে কুয়াংচৌ প্রদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার। সেখানে এখন আর আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। একজন কাপড় ব্যবসায়ী জানান, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পেট্রোকেমিক্যাল ভিত্তিক সুতা ও কাপড়ের উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। জারা, শিন বা টেমু’র মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য যারা পোশাক তৈরি করেন, তারা পড়েছেন মহাবিপদে। অনেক ক্রেতা বাড়তি দাম দিতে রাজি হচ্ছেন না, ফলে অবিক্রিত কাপড়ের রোল গুদামে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় রপ্তানি-নির্ভর চীনের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে। আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে জেদ কাজ করত, এবার সেখানে কেবলই অসহায় আত্মসমর্পণের সুর।
কিছু দূরেই বিখ্যাত ‘ক্যান্টন ফেয়ার’-এ চীন তার ভবিষ্যৎ শক্তির মহড়া দিচ্ছে। সেখানে মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবট গান গাইছে, দর্শনার্থীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন চশমা বা পাহাড় চড়ার রোবটিক পা ট্রায়াল দিচ্ছেন। বেইজিং বিশ্বকে দেখাতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে লিপ্ত, চীন তখন ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নির্মাণে ব্যস্ত।
কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালেও লুকিয়ে আছে মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা। প্রদর্শনীতে আসা ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্লাস্টিক বা তেলের ওপর নির্ভরশীল প্রায় প্রতিটি ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের দাম বাড়ছে। ফলে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের এই সময়ে চীনের ইলেকট্রিক ভেহিকেল বা বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানিতে জোয়ার এসেছে। গত মার্চ মাসেই চীন ৩.৫ লাখ ইভি রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এই সাফল্যকেও ম্লান করে দিচ্ছে।
রপ্তানিকারক জয়েস লিউ বলেন, ‘গত বছর আমার ৯০ শতাংশ গাড়ি মধ্যপ্রাচ্যে যেত। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই বাণিজ্য এখন প্রায় বন্ধ। অনেক গাড়ি বন্দরে আটকা পড়ে আছে।’ এখন তিনি আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার বাজার ধরার চেষ্টা করছেন। মেলায় বাংলাদেশ, ভারত ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের ভিড় দেখা গেছে, যারা তেলের দাম বাড়ায় সস্তায় চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনতে আগ্রহী।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক চ্যাটাম হাউসের বিশ্লেষক ইউ জি’র মতে, বেইজিং যুদ্ধের অবসান চায় কারণ তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। চীন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক পরাশক্তি নয়, বরং বিশ্বশক্তির কেন্দ্রবিন্দু হতে চাইছে। সে কারণেই তারা ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানো এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে।
তবে উচ্চপর্যায়ের এই ভূ-রাজনীতি বা প্রযুক্তির লড়াই ফোশানের সাধারণ শ্রমিকদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনছে না। ক্যান্টন ফেয়ারের টয়লেট পরিষ্কার করে দৈনিক মাত্র ১৫০ ইউয়ান (২০ ডলার) আয় করা একজন শ্রমিক হেসেই বলেন, ‘আমি সেখানে টয়লেট পরিষ্কার করেছি। ১৪ ঘণ্টা খাটুনির পর এই সামান্য আয় দিয়ে টিকে থাকা দায়।’
চীনের এই বিশাল উৎপাদন যন্ত্র এখন একদিকে যুদ্ধের দামামা আর অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। বেইজিংয়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- বিশ্বের সামনে সক্ষমতার প্রদর্শনী বজায় রেখে দেশের কোটি কোটি সাধারণ শ্রমিকের ক্ষোভ প্রশমন করা।
সূত্র: বিবিসি
