কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে দুটি জাহাজ জব্দ করেছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানে হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিলেও ওই অঞ্চলে উত্তেজনা কমেনি। বরং বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই নৌপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছে তেহরান। এদিকে, গত সপ্তাহে শেষ হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার এক আকস্মিক ঘোষণায় ট্রাম্প জানান, ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াচ্ছে। তবে ইরান এই মেয়াদ বৃদ্ধিতে সম্মতির কোনো কথা জানায়নি। উল্টো ইরানের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার কড়া সমালোচনা করেছে তেহরান।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেন, ‘অবরোধ বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির কোনো মানে হয় না।’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির এই লঙ্ঘন বজায় থাকলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আপনারা লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি, আর দাদাগিরি করেও তা পারবেন না।’
যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। বুধবার নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলানকে পদচ্যুত করা হয়েছে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে ফেলানের অপসারণের বিষয়ে পেন্টাগন স্পষ্ট কোনো কারণ দর্শায়নি।
এদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় সংঘাত আরও ছড়িয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘এপামিনোন্ডাস’ এবং পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেসকা’ নামের দুটি জাহাজ জব্দ করে ইরানি উপকূলে নিয়ে গেছে রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকা এবং নেভিগেশন সিস্টেম পরিবর্তনের অভিযোগ আনা হয়েছে জাহাজ দুটির বিরুদ্ধে। এছাড়াও লাইবেরিয়ার আরেকটি কন্টেইনার জাহাজে গুলি চালানো হলেও সেটি বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই ঘটনাকে ‘জলদস্যুতা’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের না হওয়ায় এটি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন নয়। অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনী এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি জাহাজকে ইরানে যাওয়ার পথে বাধা দিয়েছে। এশিয়ার জলসীমায় ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছ থেকেও তিনটি ইরানি ট্যাংকার ঘুরিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই অস্থিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এশিয়ার বাজারে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে অবস্থান করছে।
পাকিস্তান এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের প্রস্তাব আসা পর্যন্ত তারা হামলা স্থগিত রাখবেন। তবে হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে যে, এই আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ডেডলাইন দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করুক এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথ বন্ধ করুক। বিপরীতে ইরান দাবি করছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তারা অবরোধ প্রত্যাহার, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি চায়। একইসঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতিও তেহরানের অন্যতম শর্ত।
উল্লেখ্য, বুধবার (২২ এপ্রিল) লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সাংবাদিক আমাল খলিলসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। গত ১৬ এপ্রিলের পর এটিই ছিল লেবাননে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন। এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরান।
সূত্র: রয়টার্স
