জরুরি বিভাগ যেন অ্যাম্বুলেন্স স্টেশন

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১২ এএম

দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের প্রবেশমুখ জরুরি বিভাগের সামনে সবসময়ই অবস্থান করতে দেখা যায় অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি ও অটোরিকশা। কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে, কিন্তু যানবাহনের চাপ কমে না। সেই সঙ্গে যানবাহন চালকদের জটলা, রোগীর পরিবারের সঙ্গে দালালদের দর কষাকষি, হকারদের হাঁকডাক ‘এই পানি, মাস্ক...’, আনসার সদস্যদের বাঁশির শব্দ, হইচই এমন চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই, এটা কোনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, নাকি কোনো ব্যস্ত টার্মিনাল।

প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য ছুটে আসেন ঢামেক হাসপাতালে। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী এই প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের মুখেই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনের জটে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে প্রবেশ করতে বেগ পোহাতে হয়।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মতে, জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; প্রবেশমুখে বিলম্ব হলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু অবাঞ্ছিত ভিড়ের কারণে প্রতিনিয়ত এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয় এ হাসপাতালে আসা রোগীদের। এই অবস্থা থেকে মুক্তি যেন মিলছেই না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে প্রতিদিন প্রায় অর্ধশতাধিক অ্যাম্বুুলেন্স, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি, অটোরিকশা অবস্থান করে। দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা জরুরি বিভাগের সামনের রাস্তা যানজটমুক্ত রাখতে ব্যস্ততাও দেখান। কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

শুধু জরুরি বিভাগ নয়, একই চিত্র বহির্বিভাগের সামনেও দেখা যায়। সেখানে অটোরিকশার তীব্র যানজট, হকারদের ভিড় এবং দালালদের তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। ফুটপাত দখল করে বসেছে ভাতের হোটেল, চা-সিগারেট, ফল ও বিভিন্ন পণ্যের দোকান। রোগী ও সঙ্গে আসা স্বজন, যানবাহন চালকদের খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, সব মিলিয়ে দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে জটলা লেগেই থাকে। চালকরা তাদের রিকশা-অটোরিকশা এলোমেলো রেখে কেউ নাশতা করছেন, কেউ আবার যাত্রী খুঁজছেন। তাদের কারণেও যানজট তীব্র হচ্ছে। এসব কারণে রোগী নিয়ে হাসপাতালে ঢোকা, হাঁটাচলা এখন চরম দুর্ভোগের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় কামরাঙ্গীরচর থেকে আসা মারুফ রায়হানের সঙ্গে। তিনি জানান, তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালে প্রবেশমুখে যে অব্যবস্থাপনা দেখেন তাতে ভয় পেয়ে যান। গুরুতর অসুস্থ রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও সময়মতো হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারে না। এই অবস্থায় যেকোনো রোগী হাসপাতালের কাছে আসার পরও প্রবেশের আগেই মারা যেতে পারেন। হাসপাতালের প্রবেশপথ অবৈধ পার্কিং ও জটলামুক্ত রাখার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনের চিত্র আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অফিস টাইমের এই সময়ে হাসপাতালের ভেতরে কোনো গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া হয় না। তবে হাসপাতালের মধ্যে পার্কিং রাখা অ্যাম্বুলেন্সগুলোর সিন্ডিকেট থাকতে পারে। বছরের পর বছর তারা এখানে ব্যবসা করছে, অভিযান চালানো হলেও ফের আবার হাসপাতালের মধ্যে পার্কিং করেন। অ্যাম্বুলেন্সসহ ডাক্তারদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য বিভিন্ন সময় খোলা স্থানের ব্যবস্থা করা হলেও সর্বোপরি তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে আনসারসহ হাসপাতালের স্টাফও বিভিন্ন সময় মাইকিং করে হাসপাতালের প্রবেশপথগুলো ক্লিয়ার রাখার চেষ্টা করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের রাস্তায় ফুটপাত দখল করে ছোট-বড় প্রায় ১০০ দোকান রয়েছে। বহির্বিভাগের সামনেও প্রায় ৩০টির মতো ছোট-বড় দোকান দেখা যায়। ফুটপাত দখলমুক্ত করার ঘটনাও প্রায়ই ঘটে। সর্বশেষ চলতি মাসেও একবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। হাসপাতাল এলাকার আশপাশের ফুটপাত দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে পথচারীদের জন্য আকর্ষণীয়, পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক চলাচলের ব্যবস্থা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ১৫ এপ্রিল বুধবার এই নান্দনিক কাজের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম। ঢাকঢোল পিটিয়ে আকর্ষণীয় ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হলেও এর সৌন্দর্য থাকে না বেশি দিন। এরই মধ্যে সাবেক অবস্থানেই ফিরতে শুরু করেছে এই ফুটপাত। তারও আগে গত বছরের অক্টোবর মাসে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছিল ডিএসসিসি। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবারও পুরনো চিত্র ফিরে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আনসার সদস্য বলেন, তারা নিয়মিত যানজট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু অতিরিক্ত রিকশা ও অটোরিকশা প্রবেশ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক চালক যাত্রী নামিয়ে আবার নতুন যাত্রী খোঁজার জন্য অবস্থান করায় যানজট আরও বেড়ে যায়। হকারদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তারা মাঝে মাঝে ঢুকে পড়ে।

জরুরি বিভাগের সামনে আরেক যন্ত্রণা দালালদের দৌরাত্ম্য। কোনো রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গে দালালচক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। জরুরি রোগীদের জন্য ট্রলি ও হুইলচেয়ার বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। হুইলচেয়ার বা ট্রলি প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দরদাম করতেও দেখা যায়।

ঢামেক এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, নিয়মিতভাবে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না। তাদের মতে, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বিশেষ করে আরও জনবল নিয়োগ ও কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত