বাংলাদেশের ক্রিকেটে কিছু জয় আসে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল হয়ে থাকে না। সেগুলো হয়ে ওঠে একটি বার্তা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই জয়ও তেমনই একটি জয়। আমাদের অনেক বড় জয় আছে। নিউজিল্যান্ডে টেস্ট জয়ও আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষ একটি মুহূর্ত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এসে জেতার অনুভূতি আলাদা। কারণ প্রতিপক্ষ, পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে এই চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন।
এই ম্যাচে সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, আমরা কোনো একটি বিভাগে ভালো করে জিতিনি। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সব দিক থেকেই দল হিসেবে আমরা নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছি। ব্যাটসম্যানরা রান করেছে, স্পিনাররা উইকেট নিয়েছে, পেসাররাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। টেস্ট ক্রিকেটে এমন একটা ম্যাচ, যেখানে দলের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখে, সেটিই আসলে পরিপূর্ণ দলীয় পারফরম্যান্সের ছবি।
তবে আমার কাছে এই জয়ের আরেকটি দিক আরও গুরুত্বপূর্ণ, সেটা সম্মান। মাঠে, গ্যালারিতে, মাঠের বাইরে বাংলাদেশ দল যে সম্মান পেয়েছে, সেটি সত্যিই অন্যরকম। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের কাছ থেকে, গ্যালারিতে আসা দর্শকদের কাছ থেকে আমরা যে আচরণ পেয়েছি, সেটি আমাদের ক্রিকেটের পরিবর্তনের একটি বড় প্রমাণ।
২০০৩ সালের কথা মনে পড়ে। তখন আমরা অনেকটা পথের শুরুতে। আমাদের ক্রিকেট তখন আজকের অবস্থানে ছিল না। তাই সেই সময়ের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশকে তুলনা করলে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট। আজ আমরা শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে যাই না, জয়ের বিশ্বাস নিয়েও খেলতে যাই। আর সেই বিশ্বাসটাই ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে। এই জয় তাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের পক্ষ থেকে একটি বার্তা। আমরা আগের বাংলাদেশ নই। এখন আমরা জানি কীভাবে জিততে হয়। শুধু জানিই না, বড় দলকেও তাদের মাটিতে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে। অস্ট্রেলিয়া ভবিষ্যতে আমন্ত্রণ জানাবে কি না, সেটা আমার জানা নেই। সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশ তার বার্তাটা দিয়ে গেছে। আমরা এখানে এসেছি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি এবং জিতেছি। এখন আমাদের নিয়ে ভাবনাটা আগের মতো থাকার কথা নয়।
আরেকটি বিষয়ও আমাকে বিশেষভাবে আনন্দ দিয়েছে। পুরো ম্যাচজুড়ে গ্যালারি ছিল দর্শকে পূর্ণ। চার দিন ধরে মানুষ মাঠে এসে খেলা দেখেছে। একটি টেস্ট ম্যাচকে ঘিরে এমন আগ্রহ শুধু একটি ম্যাচের জনপ্রিয়তা নয়, এটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবস্থান পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। জয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই উদ্যাপন ছিল। এমন একটি জয় পাওয়ার পর ক্রিকেটাররা যদি একটু আনন্দ না করে, তাহলে আর কখন করবে? আমরা সবাই মিলে মুহূর্তটা উপভোগ করেছি। বোর্ড পরে কী করবে, কোনো আয়োজন করবে কি না সেটা বোর্ডের বিষয়। কিন্তু সত্যি বলতে, এমন একটি জয়ের পর ক্রিকেটার হিসেবে আর খুব বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। এমন জয়ই অনেক বড় প্রাপ্তি।
আর একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়, তানজিদ হাসান তামিম। তার পারফরম্যান্স আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আমি জানতাম, লাল বলে সে ভালো করবে। তার খেলার ধরন আমি দেখেছি, বুঝেছি। তাই আমার বিশ্বাস ছিল, টেস্ট ক্রিকেটেও সে সফল হতে পারবে। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে একটা সমস্যা আছে আমরা অনেক সময় একজন খেলোয়াড়কে যথেষ্ট সময় দিতে চাই না। কেউ নতুন এসে এক-দুই ইনিংসে ভালো করতে না পারলেই আমরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করি, সে ওই সংস্করণের জন্য কি না। অথচ একজন খেলোয়াড়কে বোঝার জন্য, বিশেষ করে নতুন কোনো ফরম্যাটে, কিছুটা সময় দেওয়া দরকার। প্রতিটি ক্রিকেটারের মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া আলাদা। এই কারণেই তার রান করা আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। সে ভালো না করলে হয়তো তাকে নিয়ে অনেক কথা হতো। সেই কথাগুলো আমার কাছে সমস্যা নয়। কিন্তু সেগুলো একজন তরুণ বা নতুন ক্রিকেটারের ব্যাটিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। সেটাই আমি চাই না। এখন সে নিজের ওপর আরও বিশ্বাস রাখতে পারবে। নিজের মতো করে খেলতে পারবে। আর একজন ক্রিকেটারের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব বেশি নেই।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই জয় শুধু স্কোরকার্ডের একটি ফলাফল নয়। এটি আমাদের ক্রিকেটের পরিবর্তনের একটি প্রতিচ্ছবি। আমরা শিখেছি কীভাবে লড়াই করতে হয়, কীভাবে বড় দলকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে জিততে হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষকে আমাদের আর শুধু সম্মান করলেই হবে না; আমাদের হারানোর পরিকল্পনাও করতে হবে।