শান্ত-মোস্তাফিজে সিরিজ জয়

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৯ এএম

বৈশাখের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে সাগরিকার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে যারা এসেছিলেন, তারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছেন পয়সা উসুলের তৃপ্তি নিয়ে। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে বাংলাদেশকে জিততে দেখার আনন্দের পাশাপাশি এক টিকিটে দুই সিনেমার মতো একই ম্যাচে বাংলাদেশের দুই ক্রিকেটারকে সেঞ্চুরি করতে এবং ৫ উইকেট নিতেও দেখলেন দর্শকরা। নিউজিল্যান্ডকে ৫৫ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতল বাংলাদেশ। আর ক্যারিয়ারের চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও ষষ্ঠবারের মতো ম্যাচে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট পেলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

টানা তৃতীয়বার টসে হারলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। তবে এবার টম ল্যাথাম আগে ব্যাটিং না নিয়ে বাংলাদেশকেই ব্যাটিংয়ে পাঠালেন। রান তাড়ায় এ দলটা কেমন করে সেটাও তো দেখা দরকার! ম্যাচের দ্বিতীয় বলেই সাইফ হাসান ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে, তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে তানজিদ তামিমও হয়ে গেলেন বোল্ড। সৌম্য সরকারও আগের মতোই, খানিকটা সম্ভাবনা জাগিয়ে ২৬ বলে ১৮ রান করে হয়ে গেলেন বোল্ড। শুরুর ৩ উইকেটই নিয়েছেন উইল ও রুর্ক। উইকেটের সামান্য কিছু সহায়তা, বলের উজ্জ্বলতা আর গরমের তীব্রতা জেঁকে বসার আগেই ৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেন ব্ল্যাকক্যাপরা। ৩২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার পর চতুর্থ উইকেটে জমে ওঠে শান্ত আর লিটন দাসের জুটি। মজার ব্যাপার ২০১৮ সালের এশিয়া কাপের তিন ম্যাচ আর ২০২২ সালে ভারতের বাংলাদেশ সফরের ম্যাচে লিটন আর শান্ত একসঙ্গে ইনিংসের সূচনায় নেমেছেন, এই ম্যাচে তাদের জুটি হলো চতুর্থ উইকেটে! একটা সময় বাংলাদেশ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জাতীয় দলে ওপরের দিকের সব ব্যাটিং পজিশনে ওপেনিং ব্যাটসম্যানদের খেলানোর সমালোচনা করতেন। এখন তিনি নিজেই দেখছেন, দলের ১১ জনের মধ্যে প্রথম পাঁচজনই ‘ওপেনার’, মেহেদি হাসান মিরাজের ওপেনিংয়ের অভিজ্ঞতা ধরলে ১১ জনে ছয়জনই ওপেনার।

শান্ত আর লিটন মিলে যোগ করলেন ১৭৮ বলে ১৬০ রান, তাতে শান্তর অবদান ৮৭ বলে ৮২ আর লিটন নিজেই সেঞ্চুরিটা হাতছাড়া করে ফিরলেন ৭৬ রানে। লেগ সাইডে অনেকটা সরে এসে লেনক্সের বলে কভার অঞ্চল দিয়ে উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন লিটন, ফ্লাইট মিস করে হয়েছেন বোল্ড। অথচ একটু ধৈর্য দেখিয়ে খেললে ৯১ বলে ৭৬ রানের ইনিংসটা সেঞ্চুরিতে রূপ নিতেই পারত। শান্ত ঠিকই তুলে নিয়েছেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতরান, ৯ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় ১১৯ বলে ১০৫ রান করার পর আউট হয়েছেন বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল ক্লান্তির কাছেই তার এ হার মানা।

শান্ত ও লিটন মিলে বাউন্ডারি মেরেছেন ১২টি, ছক্কা ৩টি; তাদের ১৬০ রানের জুটিতে বাকি ৯৪ রানই নিয়েছেন দৌড়ে। যে রসায়নটা লিটনের হয়নি সাইফ হাসানের সঙ্গে, তাই সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাঝের ওভারগুলো গেছে নিস্ফলা। নির্বাচকরা একজন ব্যাটসম্যানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে চান, সাইফ হাসানের ওয়ানডে ক্যারিয়ার নিয়ে তাদের হয়তো নতুন করেই ভাবতে হবে। সাইফের ব্যাটিং আখেরে দলকে ভোগায়, বরং তার দ্রুত বিদায়েই দলের উপকার! অন্তত স্কোরবোর্ড তো তাই বলে।

শান্ত ও লিটনের জুটি ভাঙার পর শান্তও সেঞ্চুরি করে বিদায় নিলে তাওহিদ হৃদয় আর মেহেদি হাসান মিরাজ মিলে শেষ দিকে ঠিক কাক্সিক্ষত হারে রান তুলতে পারেননি। শান্ত আউট হলেন ৪৩ ওভারের শেষ বলে। দলের রান তখন ২২১। বাকি ৭ ওভারে রান এসেছে মাত্র ৩৬! এই যুগে ওয়ানডে ম্যাচে শেষ ৭ ওভারে মাত্র ৩৬ রান, তাও ৫ উইকেট হাতে নিয়ে এমনটি রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যে দায়টা তাওহিদ হৃদয়ের, ২৯ বলে ৩৩ রান ক্রমশ তার ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির ব্যাটিংয়ের আরেকটি উদাহরণ। ৫৫, ৩০*, ৩৩* রান করে হৃদয় তার গড় বাড়িয়ে নিলেও তাতে দলের উপকার হচ্ছে সামান্যই। মিরাজের ১৮ বলে ২২ রানটাও সাতে নামা ব্যাটসম্যানসুলভ নয়। সব কিছুর যোগফলে ৫০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ২৬৫ রান। রুর্কের ৩ উইকেটের সঙ্গে বেন লিস্টার আর জেডন লেনক্সের শিকার ২টি করে উইকেট।

রান তাড়ায় শুরুতেই ঝটকা দেন মোস্তাফিজ, হেনরি নিকোলসকে আউট করে। সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে প্রথমবার একাদশে এলেন এ বাঁহাতি পেসার, এই ম্যাচের পর চলে যাবেন পিএসএল খেলতে, তাই থাকবেন না টি-টোয়েন্টি সিরিজে। যাওয়ার আগে রাঙিয়ে গেলেন ৫ উইকেট নিয়ে। সেই ২০১৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে পেয়েছিলেন ওয়ানডেতে ৫ উইকেট, এরপর দুবার ৪ উইকেট করে পেলেও ফাইফার দ্যা ফিজের হাতে ধরা দিল প্রায় সাত বছর পর!

কিউইরা উইকেট হারিয়েছে নিয়মিত বিরতিতে। ফিল্ডিংও ভালো করেছে বাংলাদেশ, মিরাজ ও হৃদয় দুটো ভালো ক্যাচ ধরেছেন। লিটনও উইকেটের পেছনে হয়ে উঠেছেন ভরসার হাত। সব মিলিয়ে ব্যাটে-বলে দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ পারফরম্যান্স। শুধু শেষবেলায় ডিন ফক্সক্রফটের মার খানিকটা কম খেলে জয়ের ব্যবধানটা বড় দেখাত। ৪৪.৫ ওভারে ২১০ রানে অলআউট নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশের জয় ৫৫ রানে। সেঞ্চুরি করে ম্যাচসেরা শান্ত আর সিরিজে ৮ উইকেট নিয়ে সিরিজ সেরা নাহিদ রানা।

জয়ের পর মিরাজের কণ্ঠে সতীর্থদের প্রশংসা ‘ম্যাচটা দারুণ ছিল, তবে সহজ ছিল না। ছেলেরা খুব ভালো বোলিং করেছে,  মোস্তাফিজও। শুরুর ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর শান্ত ও লিটনের পার্টনারশিপটা ছিল দুর্দান্ত। তারা দায়িত্ব নিয়ে খেলেছে। তারা দলের সিনিয়র খেলোয়াড়, তাদের ওপর দায়িত্ব ছিল এবং তারা সেটা খুব ভালোভাবে পালন করেছে। আমরা পিচের কন্ডিশন সম্পর্কে জানতাম, বুঝতে পেরেছিলাম যে বল স্পিন করবে এবং ফাস্ট বোলারদের জন্য বাউন্স অসমান থাকবে। আমরা জানতাম দ্রুত উইকেট তুলে নিতে পারলে তা আমাদের মোমেন্টাম দেবে। এই কন্ডিশনে কীভাবে বোলিং করতে হয়, তা ওদের জানা আছে। আজকের ফিল্ডিংয়ের কথা বলতে গেলে, ছেলেরা অসাধারণ ফিল্ডিং করেছে। বিশেষ করে ওই দুটি ক্যাচ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

এখন শান্ত ও মিরাজ ফিরে আসবেন ঢাকায়, নাহিদ রানা ও মোস্তাফিজ চলে যাবেন পাকিস্তানে। টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরুর আগে ব্যাটে কিছু রান নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাস জোগাবে লিটন দাসকেও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত