ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। স্বাস্থ্যকর পরিবেশও নিশ্চিত করতে পারছে না। চিকিৎসার এ অব্যবস্থাপনার জন্য রোগীর অতিরিক্ত চাপকে দায়ী করছে কর্র্তৃপক্ষ।
সরেজমিন ঘুরে হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা যায়। চিকিৎসাসেবা নিতে এসে রোগীরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। আসন সংকটের কারণে অনেক রোগীকে জনাকীর্ণ করিডর ও ওয়ার্ডের মেঝেতে শুয়ে থাকতেও দেখা গেছে। হাঁটার রাস্তায় রোগী ও তাদের স্বজনরা অবস্থান করতে দেখা গেছে। পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। সর্বত্র তেলাপোকার উপদ্রব। যেখানে-সেখানে পান খেয়ে থুতু ফেলা হয়। ওয়ার্ডের ভেতরেও সিগারেট খাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে।
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা সালমা খাতুন জানান, তার স্কুলপড়ুয়া ছেলেটার জ্বর দুই সপ্তাহ হয়ে গেলেও কমছে না দেখে তিনি নিয়ে এসেছেন। ডাক্তাররা দেখে ভর্তি করিয়েছেন। কিন্তু কোনো বেড খালি নেই। আপাতত মেঝেতে থাকতে বলেছেন, খালি হলে নাকি দেবেন। ফতুল্লা থেকে আসা আরেক রোগীর স্বজন জানান, তারা তিন দিন থেকে মেঝেতেই আছেন। বেড খালি হলেও তারা পাচ্ছেন না। এগুলো কীভাবে পাওয়া যায় তাও জানেন না।
একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘প্রয়োজনের সময় নার্সদের পাওয়া যায় না এমনকি ডাক্তারদেরও খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ ছাড়া প্রেসক্রাইব করা ওষুধ পাওয়া যায় না। বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালে সর্বমোট সাড়ে চার হাজারের মতো বেড রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এই বাড়তি রোগীর চাপেই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে কর্র্তৃপক্ষের দাবি।
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিষয় জানতে চাইলে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যত খারাপ মনে করি আসলে তত খারাপ না। তেলাপোকা-ছারপোকা কিছু আছে, কারণ হাসপাতাল কখনো খালি হয় না। তাই সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করাও সম্ভব হয় না। পাশাপাশি হাসপাতালে ডাক্তারের সংখ্যা পর্যাপ্ত থাকলেও স্টাফ, নার্সসহ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা তুলনামূলক খুবই কম। নার্স ও স্টাফরা একজনের কাছে গেলে অন্যজনের কাছে যেতে একটু সময় লাগে। আর সব ওষুধ সবসময় থাকেও না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে সব রোগীর জন্য সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিবেশ কিছুটা খারাপ হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়। তাই এত এত রোগী প্রতিদিন আসেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা ও তদারকির জন্য যে পরিমাণ নার্স ও অন্যান্য স্টাফ দরকার, তা না থাকায় সঠিকভাবে তদারকি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের শৌচাগারগুলো সবসময়ই অপরিচ্ছন্ন দেখা যায়। নাক বন্ধ করে ঢুকতে হয়। প্রতিটি শৌচাগারে একই সময় প্রায় ১০ জন লোক ব্যবহার করার জন্য লাইন লেগে থাকে।
দায়িত্বগ্রহণের পর নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত ৪ মার্চ আকস্মিক ঢামেক হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখে ক্ষুব্ধ হন। অব্যবস্থাপনা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন। মন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি, যা সেবার মান বজায় রাখাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। রোগীর তুলনায় এখানে সুযোগ-সুবিধা ও ফ্যাসিলিটি অপ্রতুল। পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও স্টাফের সংকট আমরা অনুভব করছি।
হাসপাতালের ভেতরেই একটি দালালচক্রকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। একজন কর্মচারী স্বীকার করেন, এখানে দীর্ঘদিন ধরে যারা কাজ করছেন, তারাই মূলত অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় জড়িত। তাদের সবকিছুই জানা। পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকার কারণে যাদের টাকা-পয়সা আছে, দালালচক্র তাদের প্রাইভেট হাসপাতালে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ সেবা নিশ্চিত করার জন্য দালালদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন, টাকার বিনিময়ে কিছু সুবিধা পান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত ৪ মার্চ হাসপাতাল পরিদর্শনকালে দালালচক্র দমনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন হাসপাতালে কাউকে দালালি করতে দেওয়া হবে না। দালালমুক্ত হাসপাতাল নিশ্চিত করতে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।
হাসপাতাল থেকে যে খাবার রোগীদের জন্য দেওয়া হয়, তার মান নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন রোগীরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের জন্য রোগীপ্রতি খাবারের বাজেট হচ্ছে ১৫০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের দাবি সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু এখানে আগের বাজেটেই চলছে। বাজেট না বাড়ালে খাবারে সুব্যবস্থা সম্ভব না।
হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থেকেও রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হয়। প্রায়ই শোনা যায়, এক্স-রে, ইসিজি, এনজিওগ্রাম, সিটিস্ক্যান, এমআরআইসহ কোনো না কোনো মেশিন নষ্ট রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালকও বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেশিন পর্যাপ্ত নেই, যা আছে তা দিয়েই সবসময় সেবা দেওয়া হচ্ছে। মেশিন নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে সার্ভিস করা যায় না। এখানেও লম্বা একটা প্রসেসিং প্রয়োজন হয়।