জীবনযুদ্ধে জয়ী আবির এখন প্রশাসন ক্যাডার

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া অসাধারণ গল্পের নাম-মো. আবির হাসান। বর্তমানে তিনি কর্মরত রয়েছেন পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশনে উপজেলা দারিদ্র বিমোচন কর্মকর্তা হিসেবে। প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করে, সংগ্রামকে শক্তিতে রূপ দিয়ে অবশেষে ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের স্বপ্ন ছুঁয়েছেন তিনি। পড়াশোনা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। পড়াশোনার পথটা সহজ ছিল না কখনোই। তবুও থেমে যাননি আবির। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে এগিয়ে নিয়েছে সাফল্যের পথে।

বাবা একজন ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। পরিবারে চার ভাইয়ের মধ্যে আবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় নতুন লড়াই। নিজের খরচ চালাতে টিউশনি, আর অবসরে পড়াশোনা-এই ছিল আবিরের প্রতিদিনের রুটিন।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে আবির হাসান বলেন, 'অনেক সময় মনে হয়েছে, হয়তো পারব না। কিন্তু লক্ষ্যটা কখনও চোখের সামনে থেকে সরাইনি।‘

৪৬তম বিসিএসের প্রস্তুতিতে আবিরের দিন-রাত কেটেছে বইয়ের পাতায়। ব্যর্থতার ভয় নয়, বরং সফল হওয়ার দৃঢ় সংকল্পই তাকে এগিয়ে নিয়েছে। অবশেষে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে জায়গা করে নিয়ে আবির প্রমাণ করলেন-স্বপ্ন দেখলে, পরিশ্রম করলে, বিসিএস জয়ে কোনও বাধাই বড় নয়।

আবির ৪৬তম বিসিএসে তার ভাইভা অভিজ্ঞতা দেশ রূপান্তরের সঙ্গে শেয়ার করেছেন।

বোর্ড চেয়ারম্যান ড. মহিউদ্দিন আহমেদ: How are you brother?
আমি: Alhamdulillah, I am fine sir. And how are you?
চেয়ারম্যান: Really fine.
চেয়ারম্যান: Wow! smiling face. হাতটাও শক্ত লাগছে। ছেলের কনফিডেন্স আছে কিন্তু। ক্যাডার হবেন তো নাকি? ভরসা আছে তো?
আমি: স্যার আমি আশাবাদী।
চেয়ারম্যান: গুড। আমাদের বোর্ডের ওপর ভরসা আছে আপনার?
আমি: দুঃখিত স্যার, আপনাদের কারোর ওপরেই আমার ভরসা নেই। আমার ভরসা একমাত্র আল্লাহর ওপর।
(চেয়ারম্যান স্যার মুচকি হাসলেন।)
চেয়ারম্যান: You have a nice suit. looking gorgeous. 
আমি: Thank you so much sir.
(আমাকে তারপর ম্যাপের কাছে নিয়ে গেলেন এবং তুরস্ক কোথায় তা দেখাতে বললেন। আমি ১সেকেন্ডেই নির্দেশ করলাম।)
চেয়ারম্যান: তুরস্ক কোন মহাদেশে অবস্থিত? 
আমি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সকল চিঠিতে তুরস্ককে এশিয়া মহাদেশের দেশ বলেই উল্লেখ করা হয়। তবে এর একটি অংশ ইউরোপে অবস্থিত। 
চেয়ারম্যান: সেই অংশের নাম কী?
আমি: স্যার, ইস্তাম্বুল।
চেয়ারম্যান: তাহলে তুরস্ককে কোন ধরনের দেশ বলা যায়?
আমি: ইউরেশিয়ান দেশ বলা যায়। 
চেয়ারম্যান: Have you heared the term "Tripple nexus system"?
আমি: Yes sir.
চেয়ারম্যান: What is this?
আমি: answered.. 
চেয়ারম্যান: What is your first choice?
আমি: Sir. BCS administration.
চেয়ারম্যান: why?
আমি:Answered.
চেয়ারম্যান: You have graduated from Marketing Department. Is there any alignment between Admin cadre and Marketing?


আমি: Answered.
(এই দুটোর প্রশ্নের উত্তর শুনে পুরো বোর্ডকে অনেক convinced মনে হয়েছে।)
এরপর আর একটা প্রশ্ন করছিলেন। উত্তর দিতে পারিনি। 
চেয়ারম্যান: Please go and have your seat
ধন্যবাদ দিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলাম। 
Ex1: Could you tell us one reason for which you are suitable for the Admin Cadre?
আমি: Answered (Sir was convinced)
ex1: বাংলাদেশের কিছু সমস্যার কথা বলেন।
আমি: অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করলেও, স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও নানা সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই সমস্যা আছে। (সব ক্ষেত্রের ২/৩টা করে উল্লেখযোগ্য সমস্যার কথা বললাম)
Ex1: What is the root cause of these problems:
আমি: Sir, Lack of good governance. 
Ex1: why not Corruption?
আমি: Sir, Corruption itself is the outcome of lack of good governance.
Ex1: আমাদের দেশে এত দুর্নীতির কারণ কী? 
আমি: অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ ১. সুশাসনের অভাব ২. আইনের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত না করা ৩. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের কাঠামোগত দৈন্যতা ৪. চাকরিজীবীদের প্রতি সামাজিক চাপ ৫. ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধের অভাব।
Ex1: আমাদের দেশে তো মুসলিম সংখ্যাঘরিষ্ঠ। ইসলামে তো দুর্নীতি নিষিদ্ধ। তাহলে আমরা দুর্নীতি কেন করি?
আমি: স্যার, আমরা মুসলমান যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে ইসলামের মৌলিক নির্দেশনাসমূহ মানতে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকেই প্রাধান্য দেই। অনেকটা বলা যায়, আমাদের মুখে ধর্ম যতটা প্রাধান্য পায়, অন্তরে তার বিন্দু পরিমাণ লালন করি না। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ আমাদের মাঝে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি। তাই, মুসলিম হয়েও দুর্নীতি করতে ছাড় দেই না।
Ex1: আপনিও কি প্রশাসন ক্যাডারে এসে দুর্নীতি করবেন নাকি?(মুচকি হাসলেন)
আমি: স্যার, ইতোমধ্যে আমি উপজেলা প্রশাসনের একটি দপ্তরের প্রধান হিসেবে কর্মরত আছি। সেখানে আমি সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করে চলছি। এমনকি, আমি আমার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক পরিমণ্ডল ও বন্ধুদের থেকে নৈতিকতার শিক্ষা লাভ করেছি। আমি বিশ্বাস করি, পেশাগত জীবনে তা অক্ষুণ্ণ রাখব।
ex1: গুড, এসব দুর্নীতি করবেন না। এগুলো ভালো জিনিস না।
আমি: ইনশাআল্লাহ স্যার।
Ex2: বাংলাদেশের এমন একটি দুর্যোগের নাম বলেন যা পূর্ব থেকে অনুমান করা যায় না।
আমি: ভূমিকম্প 
Ex2: বাংলাদেশকে যদি ভূমিকম্প প্রবণতার ওপর ভিত্তি করে ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত করতে বলা হয়, পারবেন?
আমি: জ্বি স্যার।
Ex2: আচ্ছা, ম্যাপের কাছে যান। ম্যাপে দেখান।
(আমি ম্যাপের কাছে গিয়ে অতি ঝুঁকিপূর্ণ, মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভাগ করে দেখালাম।)
Ex2: ঠিক আছে। চেয়ারে বসেন। 
(আবার চেয়ারে গিয়ে বসলাম।)
Ex2: সম্প্রতি তো দেশে কয়েকবার ভূমিকম্প হলো। ঢাকা তো অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে। এই ঝুঁকি থেকে বাঁচতে কী পদক্ষেপ নিবেন?
আমি: স্যার, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এমনকি অপরিকল্পিত নগরায়ণের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ভূমিকম্প হতে বাঁচতে প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনসমূহ ভেঙে ফেলতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রোপার বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ঢাকাকে ডিসেন্ট্রালাইজ করতে হবে। চতুর্থত, দুর্যোগ মোকাবেলায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। 
Ex2: GDP কিভাবে মাপা হয়?
আমি: স্যার, GDP=C+I+G+X-M.
Ex2: এগুলোর মানে কী?
আমি: স্যার, C- Consumption, I- Investment, G-Government Expenditure, X- Export, M- Import.
Ex2: Good. What is the difference between GDP and GNP?
আমি: Answered.


Ex2: Tax-GDP ratio কত বর্তমানে?
আমি: স্যার, NBR হতে প্রাপ্ত তথ্যে অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের Tax-GDP ratio ছিল ৬.৬%। 
Ex2: এটা কত থাকা উচিত?
আমি: IMFসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনও দেশের এই রেশিও ন্যূনতম ১৫% রাখতে বলে। সেই হিসেবে কমপক্ষে ১৫% থাকা উচিত।
Ex2: এটা বেশি থাকা ভালো নাকি কম থাকা ভালো?
আমি: স্যার, বেশি থাকা ভালো।
Ex2: কেন?
আমি: এই রেশিও যত বেশি হবে, দেশের অর্থনৈতিক স্বয়ংবরতা তত বেশি হবে। অর্থাৎ, দেশের সকল খরচ মেটানো ও বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় অর্থ টেক্স থেকেই আসবে। ফলে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উৎস হতে সরকারকে খুব বেশি ঋণ করতে হয় না। 
Ex2: আচ্ছা, অনেকেই বলেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক খারাপ হওয়ার জন্য নাকি ধর্ম দায়ী। আপনিও কি তাই বিশ্বাস করেন?
আমি: না স্যার।
Ex2: কেন বিশ্বাস করেন না?
আমি: স্যার যদি ধর্ম মূল কারণ হতো, তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের পাশাপাশি ইরান বা আফগানিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ হতো। আবার নেপাল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার পরেও সম্পর্ক খারাপ হতো না। মূলত, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে ভারত তাদের সম্মানের আঘাত হিসেবে দেখছে। বহুদিন ধরে বাংলাদেশে চলা ভারতের নিয়ন্ত্রণের সমাপ্তি ঘটে গেছে। তদুপরি, ভারত তাদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে পাশে না পাওয়ার শঙ্কাতে আছে। তাছাড়া, দুইদেশের তথাকথিত মিডিয়ায় অপতথ্যের ছড়াছড়ি, যা আগুনে ঘি ঢালছে। 
Ex2: ইরান, আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক ভালো কেন?
আমি: প্রথমত, এই দুই দেশেই ভারতের বিশাল বিনিয়োগ আছে। ইরানে বন্দর ব্যবস্থাপনায় ভারতের বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, চীন ও পাকিস্তানকে মোকাবিলা করতে আফগানিস্তানকে পাশে দরকার। অপরদিকে, এই দুইদেশই ভারতের জন্য মধ্য এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগকে সহজ করেছে। তাছাড়া, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ তো আছেই।
চেয়ারম্যান স্যার: চেয়ার থেকে উঠে সামনে আসেন। 
(আমি উঠে সামনে গেলাম।)
চেয়ারম্যান: আপনি তো মার্কেটিং থেকে পড়ছেন। আপনার বিষয় থেকে যেকোনও টপিক নিয়ে আপনি ইংলিশে লেকচার দেন। মনে করেন আমরা তিনজনই আপনার ছাত্র।
চেয়ারম্যান: আপনার BBA, MBA তে CGPA কত?
(আমি উত্তর করলাম।)
চেয়ারম্যান: (মুচকি হেসে) এইজন্যই তো এত পটপট করে সব বলতেছেন। এর আগে কোনো বিসিএস দিয়েছেন? 
আমি: স্যার, আমি ৪৪তম এবং ৪৫ বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে অনুত্তীর্ণ হই। এ ছাড়া ৪৭তম রিটেন দিয়েছি ও ৪৯তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। 
চেয়ারম্যান: এই যে আবার একজন রিপিট ক্যাডার। By the way Abir, we have done with you. You may go now. Best of luck.
আমি সালাম দিয়ে বের হয়ে এলাম।

মো. আবির হাসান
৪৬ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার (সুপারিশপ্রাপ্ত)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত