নতুন অর্থবছর ২০২৬-২০২৭ সালের জাতীয় বাজেটে সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি খাতভিত্তিক সমস্যার চিত্র তুলে ধরছেন ব্যবসায়ী নেতারা। প্রতিদিন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে এসব বিষয়ে চলছে প্রাক-বাজেট আলোচনা। এতে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
গতকাল রবিবার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ); বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সহ আরও কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন।
সভায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু দাবি করেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং বর্তমানে আরও বহু কারখানা আর্থিক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে খাতসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বৈশ্বিক মন্দা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উৎসে কর হ্রাস, নগদ সহায়তায় কর অব্যাহতি ও সোলার পিভি সিস্টেমের কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা দাবি করেছে বিজিএমইএ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাজেট প্রস্তাবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য রপ্তানির বিপরীতে দশমিক ৫ শতাংশে উৎসে কর স্থির রাখার দাবি জানায়। এ সময় ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও ‘ব্যাটারি আমদানির বিধিনিষেধ’ এবং ‘কাস্টমস জটিলতায়’ এ শিল্পের উদ্যোক্তারা ‘বাধার মুখে পড়ছেন’ বলে দাবি করেন তিনি।
লিখিত বক্তব্যে বিজিএমইএ বলেছে, শিল্পের বর্তমান এই স্থবিরতা ও মন্থর গতির পেছনে মূলত দুটি কাঠামোগত কারণকে দায়ী করেছে সংগঠনটি। প্রথমত, ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এবং দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, নীতি স্থিতিশীলতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পটি পিছিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে অর্থায়ন ও লজিস্টিক ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সম্মিলিতভাবে এই খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফেব্রুয়ারি ২০২৫-২৬ সময়ে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মোট পোশাক রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কারখানাগুলো পরিমিত সক্ষমতায় চলতে পারছে না; ফলে ফিক্সড কস্ট আনুপাতিক হারে বেড়েছে। এই কারণে পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর কর্তন অব্যাহতি, রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে হ্রাস করে শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ করা ও তা পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণ করা এবং সাব-কন্ট্রাক্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চুক্তির মূল্য পরিশোধের সময় ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর কর্তন হতে অব্যাহতির প্রস্তাব করে বিজিএমইএ। এ ছাড়া সোলার পিভি সিস্টেমের কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা দেওয়া এবং ইটিপি-সহ একাধিক কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা দাবি করেছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএ জানায়, বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১২-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট রয়েছে। ২০১৭-২০২৩ সময়কালে গ্যাসের দাম ২৮৬ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম গত ৫ বছরে ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে ন্যূনতম মজুরি ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ সহায়তার বা প্রণোদনার বিপরীতে পাঁচ শতাংশ কর প্রত্যাহার এবং বস্ত্র খাতের বিভিন্ন আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতা নিরসনের দাবি জানিয়ে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ইনসেন্টিভের ওপর ট্যাক্স পাঁচ শতাংশ, যেটা আমরা পাই। এটা এক ধরনের প্রণোদনা। প্রণোদনার ওপরে যদি আবার ট্যাক্স হয়, এটা দেখতেও বা কেমন লাগে শুনতেও বা কেমন লাগে। তো এটার আমি মনে করি প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
সভায় বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমইএ) সভাপতি এম শাহাদাত হোসেন এনবিআর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমস, আয়কর পরিদর্শকদের অত্যাচার বন্ধ করেন। আমরা কোনো জিনিস কমানোর জন্য বলব না, যা চাইবেন তাই দেব। ঘুষ বন্ধ করেন, কোনো দিন কোনো কিছু (করহার) কমানোর জন্য বলব না। একদম দায়িত্ব নিয়ে বলছি, কেউ বলবে না কমান।