দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজাত ক্লাবে নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এক দশকের নিরবচ্ছিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ এবং জটিল সব কারিগরি ধাপ পেরিয়ে অবশেষে মিলেছে কাক্সিক্ষত ‘কমিশনিং লাইসেন্স’। আগামী ২৮ এপ্রিল পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমেই শুরু হবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরীক্ষামূলক উৎপাদন প্রক্রিয়া।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক নানা প্রতিবন্ধকতায় কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও সরকারের দৃঢ়তায় এই মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারি এবং নিরাপত্তার সব শর্ত পূরণ করায় গত ১৬ এপ্রিল রূপপুর কর্তৃপক্ষকে পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের লাইসেন্স প্রদান করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ২৮ এপ্রিল বিকেলে প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কাজ এগিয়ে নিতে ইতিমধ্যেই নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে আগামী জুলাই বা আগস্ট মাসের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে। এক বছর পর প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে সেখান থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে দেশ।
তবে প্রকল্পের কারিগরি জটিলতা দূর করে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি বেশ কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজের উদ্বোধনের সময় উৎপাদনের সময়সীমা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও নিরাপত্তা প্রটোকল ও আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখতে সময়সীমা বারবার সংশোধন করা হয়। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ১২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, এতদিন মূল কাজ ছিল অবকাঠামো নির্মাণ, এখন ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্যদিয়ে দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তার মতে, জ্বালানি লোড করার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো চেইন রিঅ্যাকশন বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি উৎপাদন শুরু করা। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য পরমাণু বিদ্যুৎ অপরিহার্য। তবে স্পর্শকাতর প্রকল্প হওয়ায় এর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও নিয়মিত মনিটরিংয়ে শতভাগ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। আইএইএ’র নির্ধারিত প্রতিটি প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা না হলে বিশাল এই বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছুটা দেরি হওয়াকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী নিরাপত্তা ও কারিগরি মানদ- বজায় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব বাধা কাটিয়ে রূপপুরের প্রথম ইউনিট এখন কমিশনিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৫৯জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যেই অপারেটিং লাইসেন্স লাভ করেছেন।
বর্তমানে রূপপুর প্রকল্পে পাঁচ হাজার রুশ কলাকুশলী ও ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত আছেন। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য দক্ষ দেশীয় জনবল তৈরি করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে কেন্দ্রটির পূর্ণ পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের হাতে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
