মিতব্যয়ী ও সতর্ক হওয়ার এখনই সময়

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২০ এএম

কিছুতেই সংকট পিছু ছাড়ার নমুনা নেই। গরম বেড়েছে। কালবৈশাখী হানা দিচ্ছে, বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। হামে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। ঢাকা শহরে লোডশেডিং কম হলেও, জেলা এবং গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, কোথাও ৩০ শতাংশ, কোথাও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি থাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। আগামী মে-জুনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।  মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা অব্যাহত থাকলে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তখন আবার হারিকেন-মোমবাতির যুগে ফিরে যেতে হয় কি-না, এ তাড়না দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ সংকট থেকে যত দূর সম্ভব রেহাই পেতে খরচপাতিতে সাশ্রয়ী নীতি নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সহকর্মীসহ দেশবাসীকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহবান তার। এর মধ্যেই হামে প্রতিদিন শিশুমৃত্যুর মিছিল। বড় রকমের প্রাকৃতিক ঝড়ের পূর্বাভাস। বজ্রপাতে প্রায় প্রতিদিন অপমৃত্যু। জ্বালানি সংকটে বেশ কিছুদিন বন্ধ ২০টির মতো বিদ্যুৎকেন্দ্র। শিগগিরই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা নেই। ডিজেলের অভাবে কৃষি সেক্টরে সেচ নিয়ে হাহাকার। কৃষি উৎপাদন ব্যাহতের জেরে সামনে খাদ্যসংকটের শঙ্কা রয়েছে। হাম পরিস্থিতি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বাড়ছে। এই ধারাবাহিকতায় হাম মহামারী পর্যায়ে চলে যায় কি না, সেই ভাবনা জনস্বার্থ বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, সঠিক পদ্ধতি না মানলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে তাদের কেউ কেউ হাম নিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামের চাপে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত মানুষ ক্লান্ত, অসহায়। 

চাহিদার তুলনায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেক, ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। দেশে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৫৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ। এগুলো বেশিরভাগই গ্যাসের অভাবে স্থবির। আবার অনেক স্টেশন কম জ্বালানির কারণে ক্যাপাসিটি অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। কিছু স্টেশন মেইনটেনেন্সের কারণে বন্ধ। বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর কোনো সুযোগ নেই। লোডশেডিংয়ে শিল্প, বিনিয়োগে নিদারুণ স্তব্ধতা। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে রাজধানীর বাইরের সাধারণ মানুষ। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। এটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানাতে হয় না। আমজনতার তা বোধগম্য। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে, দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন। ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলে, ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়। কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদনও কম। সবদিক দিয়েই পরিস্থিতি খারাপ। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেটা নিশ্চিত করা, লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং গ্রাম-শহরে বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায়, পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মানে ভোগান্তির বৈষম্য দূর করা। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম সংসদে বলেছেন, ‘আমরা মনে করি, শহরের মানুষ আরামে থাকবে এবং গ্রামের মানুষ অর্থাৎ খেটে খাওয়া কৃষক কষ্টে থাকবে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ সমাজ অর্থাৎ শহর এবং গ্রামের মধ্যে যেন কোনো বৈষম্য না থাকে। বিদ্যুতের কারণে এসএসসি পরীক্ষায় যেন সমস্যা না হয় এ রকম একটি  নির্দেশনা রয়েছে। শুনতে ভালো লাগলেও বাস্তবতা ভিন্ন। লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, এমনকি পরীক্ষায় কেমন ভোগান্তি হচ্ছে, তা লুকানো বা অস্বীকারের জো নেই।  রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার একটি পরীক্ষাকেন্দ্রে বিদ্যুৎ না থাকায়, মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার খবরটি ভাইরাল হলেও কাছাকাছি ঘটনা আরও কোথাও কোথাও আছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভের জবাবে জানানো হয়েছে, ‘পরীক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকার কথা বলা হলেও, বিদ্যুৎ অফিসে বারবার জানানোর পরেও সমাধান হয়নি। পরীক্ষার্থীরা কেবল কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী নয়। বাড়িতে-ছাত্রাবাসেও পরীক্ষার্থী। কেন্দ্রে মোমবাতি জ্বালিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার ঘটনা খবরের বিষয় হয়েছে। বাড়িতে-হোস্টেলে-ছাত্রাবাসে কী দশা, সেভাবে তা নিউজ আইটেম নয়। সামনে সুখবরের আভাস নেই। সেখানে বৈশ্বিক সমস্যা যোগ হয়ে আশায় গুড়েবালি পড়ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরিকল্পিত দ্বিতীয় দফার যুদ্ধবিরতি আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত সপ্তাহের শেষের দিকের কূটনৈতিক অচলাবস্থার জেরে, ২৬ এপ্রিল রবিবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ১০৬.৯৯ ডলারে স্থির হয়েছে। মাঝে দাম কিছুটা কমার আভাস পাওয়া গেলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা বাজারকে আবারও অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫ ভাগের ১ ভাগ পরিবাহিত হয় পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই পথটি কার্যত অচল। যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথে দৈনিক গড়ে ১২৯টি জাহাজ চলাচল করত। গত শনিবার মাত্র ১৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের হুমকির ফলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যা তেলের দাম বাড়ার প্রধান কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড  ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও, স্থায়ী শান্তিচুক্তির শর্তাবলি নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে,  বিশ্ববাজারে তেলের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ভর করেছে। সময়টা এমন রোদ-গরমের মধ্যে বেশি বৃষ্টি নামলেও সমস্যা। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর আগামী সাত দিনের বৃষ্টিপাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে। আসমানে মেঘ দেখলে বুক কাঁপে কৃষকদের। হাওরের কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমেছে। এতে ধান কাটলেও বিপদ, না কাটলেও বিপদ। হাওরে পানি থাকায় মেশিন চলছে না, অন্যদিকে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। এ আরেক উভয়সংকট। বৈরী আবহাওয়া, আকস্মিক বন্যার শঙ্কাসহ নানা কারণে হাওরের কৃষকরা এখন বিপাকে পড়েছেন। একদিকে বন্যার পূর্বাভাস, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। বন্যার আশঙ্কায় হাওরাঞ্চলে কেউ কেউ আধাপাকা ধান কাটা শুরু করেছে। ফলন ভালো হলেও তা উৎপাদন কমাবে। মানে পরিমাণে কম হবে। খাদ্য উৎপাদন কম হওয়া আরেক সংকট।

একদিকে বৈশ্বিক তাড়না, আরেক দিকে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি। তার ওপর রয়েছে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খননসহ নানা ঘোষণা। এগুলোর বাস্তবায়নে টাকা লাগবে, আগের তুলনায় অনেক বেশি। এসব কাজে পূরণে সরকারের পক্ষে ব্যয় অনেক কমিয়ে আনার সুযোগ নেই। রাতারাতি রাজস্ব আয় বাড়ানোর অবস্থাও নেই। এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল, ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এ সময় রাজস্ব আয়ের তিনটি খাতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। সামনে এ ঘাটতি-কমতি-খামতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, ধারণা করা যায়? অর্থের এ অকুলানের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানির বাড়তি দাম, গেল সরকারের বিদায়ের আগে ঘোষিত সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি বেতনও অগ্রাহ্যের সুযোগ নেই। তাদের নতুন পে-স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায়, দাতাগোষ্ঠীর প্রকল্প অনুদান এবং বৈদেশিক সাহায্যের কী অবস্থা দাঁড়াবে, তা নিয়ে ঘুরছে নানা শঙ্কা। এ ক্ষেত্রে মোটাদাগে ভরসার জায়গায় অবস্থান ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা।  অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সচল রাখতে, ব্যবসায়ীদের অগ্রাহ্য করা ঠিক নয়। বিষয়টি সময় থাকতে বোঝেননি অন্তর্বর্তীরা। এর পরিণতিতে দেশকে ভুগিয়েছেন, নিজেরা ভুগেছেন, গালমন্দ শুনেছেন। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে বাজেট বাস্তবায়ন, মুদ্রানীতি, রপ্তানি-আমদানির ভারসাম্য, বিনিয়োগের পরিবেশ সরকারকে বাইরের কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। সরকার এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেবে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। এ রকম অবস্থায় রাজনীতিতে নানা কাসুন্দি-ফাসুকি ঢোকাচ্ছে কারা? কী তাদের মতলব? প্রায় প্রতিটি সরকারই এখানে রাজনৈতিক দলপ্রধান বা ব্যক্তিনির্ভর ছিল, এখনো আছে। প্রায় প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেছে যে সরকারপ্রধান, তার মর্জি অনুযায়ী সবকিছু করবেন এবং মেয়াদের নির্ধারিত পাঁচটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পরের মেয়াদে কীভাবে সরকারে ফিরে আসা যায়, সেই ফন্দিফিকির ও কৌশল রচনা করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো তক্কে তক্কে থাকে,  সরকার কখন তাদের বড় ভুলগুলো করে। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত