প্রতিটি দায়িত্ব আমানত। আমানতের ব্যাপারে আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির অনুভূতি থাকা জরুরি। অন্যথায় দায়িত্ব পালনে অবহেলা চলে আসার সম্ভাবনা থাকে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মানুষকে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে তার অন্তরের তাকওয়া। কারণ বাহ্যিক নজরদারি সবসময় থাকে না। কিন্তু একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, মানুষ না দেখলেও আল্লাহ তাকে দেখছেন। কেউ হিসাব না নিলেও একদিন আল্লাহর দরবারে প্রতিটি দায়িত্বের হিসাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই তাকে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক, সতর্ক ও নিষ্ঠাবান করে তোলে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা ৫৮) আয়াতটি শুধু অর্থ-সম্পদ বা কারো গচ্ছিত বস্তু রক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বরং মানুষের ওপর অর্পিত সব ধরনের দায়িত্বও এর অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষককে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা আমানত। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির পদ আমানত। অভিভাবকের কাছে সন্তান আমানত। এমনকি নিজের শরীর, সময়, মেধা ও সামর্থ্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমানত।
তাই দায়িত্ব পাওয়া মানে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জবাবদিহির কঠিন প্রশ্ন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় যদি মনে রাখা যায়, একদিন এ দায়িত্বের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে, তাহলে দায়িত্ব পালনের ধরনই বদলে যায়।
মানুষের সামনে দায়িত্বশীল হওয়া তুলনামূলক সহজ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখছেন, মানুষ প্রশংসা করছে, পদমর্যাদা আছে, তখন অনেকেই দায়িত্ব পালনে সচেতন থাকে। কিন্তু প্রকৃত দায়িত্বশীলতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন কেউ দেখছে না, প্রশংসা করার কেউ নেই এবং অবহেলা করলেও তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তির ভয় নেই। এখানেই আল্লাহভীতির প্রয়োজন।
তাকওয়া মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব নয়। ফলে সে দায়িত্ব পালনে প্রতারণা করে না, সময় নষ্ট করে না, ক্ষমতার অপব্যবহার করে না এবং নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর অযথা চাপিয়ে দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস একজন মুমিনের জীবনকে দায়িত্ববোধে জাগ্রত করার জন্য যথেষ্ট। এখানে দায়িত্ব শুধু শাসক বা বড় কর্মকর্তার জন্য নয়, বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য। অর্থাৎ আমি যে অবস্থানেই থাকি, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।
বর্তমান সময়ে অনেকেই দায়িত্বকে সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখেন, কিন্তু দায়িত্বের বোঝা হিসেবে দেখেন না। পদ পেলে আনন্দ হয়, পরিচিতি বাড়ে, ক্ষমতা আসে। কিন্তু দায়িত্বের সঙ্গে যে জবাবদিহি আছে, সেটি অনেক সময় মানুষ ভুলে যায়।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি মনে করেন, আমি এখানে সবার ওপর কর্র্তৃত্ব করি, তাহলে তার আচরণ এক রকম হবে। আর যদি মনে করেন, আল্লাহ আমাকে এই মানুষগুলোর দায়িত্ব দিয়েছেন, আমাকে তাদের হক আদায় করতে হবে, তাহলে তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না। বরং ক্ষমতার সঠিক ব্যবহারই মানুষকে বড় করে।
দায়িত্বে সামান্য অবহেলাও কখনো কখনো বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। একজন শিক্ষক যদি পাঠদানে গাফিলতি করেন, তার প্রভাব বহু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে পড়তে পারে। একজন অভিভাবক যদি সন্তানের চরিত্র গঠনের ব্যাপারে উদাসীন হন, তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। একজন কর্মচারী যদি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ফাঁকি দেন, প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হতে পারে। আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি নিজের দায়িত্বে অবহেলা করেন, তার ক্ষতির পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই দায়িত্বে অবহেলা শুধু কাজের ত্রুটি নয়, অনেক সময় এটি মানুষের হক নষ্ট করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা যদি দায়িত্ব পালনের সময় মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিই, তাহলে দায়িত্বে সততা আসবে। কেউ দেখুক বা না দেখুক, আমরা দায়িত্ব পালন করব। কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক, আমরা আমানত রক্ষা করব।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ