জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেছেন, এই সংসদের প্রথম দিন থেকেই আননেসেসারি (অপ্রয়োজনীয়) একটি জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছেন। এর প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। এ সময় হইচই ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
গতকাল সোমবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাত্র দুই মাসের সরকার এই অল্প সময়ে যে সফলতা অর্জন করেছে আজকে এই সফলতা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। এমনকি নেপালের নতুন সরকার আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করছে। কিন্তু‘ আফসোসের বিষয় যে আমাদের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একটা ধন্যবাদ বাক্য শোনলাম না। বিরোধী দলের নেতা বলেছিলেন, উনি নাকি আমাদের মন পেতে চাচ্ছেন। কিন্তু‘ পাচ্ছেন না, আমাদের মন কীভাবে পাবেন। উনারা যদি জুলাই আন্দোলনকে তাদের একক অর্জন বলে দাবি করতে চান তখন তো আমাদের মন ব্যথিত হয়, তখন তো আমরা তাদের এই মন কীভাবে দেব?
বিরোধী দল ও জোটের উদ্দেশে এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, কয়েক দিন আগে বিরোধী দলের এক সদস্য এই সংসদে বলেছিলেন তৎকালীন জুলাই আন্দোলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখিয়ে এক পুলিশ অফিসার যে ভিডিও দেখাচ্ছিল যে একটা গুলি করলে একটাই মরে, বাকিরা সরে না। যারা সরে না এটা নাকি তারাই ছিলেন। সেখানে তো আমরাও ছিলাম। তাহলে আমাদের ৪০০ এর অধিক সহযোদ্ধাকে আমরা কীভাবে হারালাম? তিনি বলেন, এই সংসদের প্রথম দিন থেকেই আননেসেসারি একটি জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছেন। আজকে আমি একটি সত্য তুলে ধরতে চাই ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলন হয়েছে। অনেকেই হয়তো জানেন না আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই লন্ডনের টাওয়ার হিলে একটি সমাবেশে উনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে কখনো আসে, তাহলে এই যে কোটা সমস্যা, এই কোটাকে ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কতটা বিচক্ষণ কতটা দূরদর্শী যে আজ থেকে সেই ২০১৪ সালে তিনি সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। মাননীয় স্পিকার ২০২৪- এর গণহত্যার দাগ লেগে আছে আওয়ামী লীগের হাতে। ৯০-এর ছাত্র হত্যার দাগ লেগে আছে জাতীয় পার্টির হাতে। আর ৭১-এর গণহত্যার দাগ লেগে আছে আরেকটি দলের হাতে। বাংলাদেশে বিএনপি একমাত্র দল যাদের হাতে কোনো রক্তের দাগ নেই। আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে ছিলাম, আই রিপিট ১৭ বছর। এখানে আমার ডান পাশে যারা বিরোধী দলের সদস্য আছেন তাদের অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার হয়তো তিন চার বছরের বেশি নয়। আমাদের রাজপথের হুঙ্কার দিয়ে রাজপথে আন্দোলনের কথা বলে লাভ নেই। আপনারা যদি আমাদের মন পেতে চান তাহলে ওপেন হার্ট (মুক্ত হৃদয়) নিয়ে আসুন ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে এই বাংলাদেশকে গড়ব।
এম মঞ্জুরুল করিম রনির বক্তব্যের বিরোধিতা করে পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বলেন, দুঃখজনকভাবে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ, যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় আজকের সংসদ যে গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায়, আজকে ট্রেজারি বেঞ্চের সরকার গঠন করেছেন যারা আজকের এই মহান সংসদে জুলাইকে আননেসেসারি বলা হয়েছে। জুলাই আলোচনাকে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জুলাই সনদকে আননেসেসারি বলা হয়েছে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ সময় সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন।
হইচইয়ের মধ্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমাকে অ্যাড্রেস করে কথা বলবেন আপনারা। যা কিছু বলবেন স্পিকারকে অ্যাড্রেস করে বলবেন। এখানে তো বিভিন্ন দলের সদস্য রিপ্রেজেন্টেড, প্রত্যেকের কী একই অনুভব হতে পারে? গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভিন্নতা।
স্পিকার কথা বলার সময়ও সংসদ সদস্যরা হইচই করতে থাকেন। তখন স্পিকার বলেন, যখন স্পিকার কথা বলে, অনুগ্রহ করে সবাই চুপ করে বসে থাকবেন নিজের আসনে।
স্পিকার বলেন, সবারই বাকস্বাধীনতা আছে। এবং যদি কোনো বক্তব্য আপনাদের পছন্দ না হয়, এরপরেই তো আপনারা একজন বক্তব্য রাখবেন, তিনি এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে আপনাদের মতামত আপনারা প্রচার করতে পারেন সুন্দর শালীনভাবে। যে যার বক্তব্য জাতীয় সংসদে রাখবেন এটাই আমরা আশা করি। অহেতুক একজন বক্তাকে কেউ ডিস্টার্ব করবেন না।
এরপর মাগরিবের নামাজের জন্য অধিবেশনের বিরতি দেওয়া হয়। বিরতির পর চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, তিনি সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিমকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করেছেন। ওই সদস্য বলেছেন, তিনি বলেছেন ‘আননেসেসারি’ বিতর্ক করা যাবে না। প্রয়োজন হলে এটি এক্সপাঞ্জ করে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মাগরিবের বিরতির পরে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর উপাদানগুলো এখনো রয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘হাসিনাকরণ’ বা ‘আওয়ামীকরণ’ বন্ধ না হলে কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃত সুশাসন পাওয়া সম্ভব নয়।
আখতার হোসেন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হাজার হাজার ছাত্র-জনতা শহীদ ও পঙ্গু হয়েছেন। এই সংসদ সেই ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতীক। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পাশাপাশি যারা কারাবরণ করেছিলেন, তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
