ডারউইন টেস্ট শুরুর আগের দিন বেশ তাচ্ছিল্যের সুরেই প্যাট কামিন্সকে একজন প্রশ্ন করেন, এই টেস্ট পাঁচ দিনে যাবে? অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কের জবাব ছিল, ‘কে জানে!’ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার পর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কম বিদ্রুপ হয়নি! নাজমুল হোসেন শান্তরা ম্যাচ তিন দিনে নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তারা। অথচ খেলা মাঠে গড়াতেই দৃশ্যপট পুরো উল্টে যায়। স্বাগতিকরাই এখন পরাজয়ের শঙ্কায়। অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবার টেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের অবস্থান এতটাই শক্ত যে, আজ চতুর্থ দিনেই টেস্টের ভাগ্য চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছে অস্ট্রেলিয়া।
এখনো পিছিয়ে আছে ৬৭ রানে। ইনিংস পরাজয় এড়াতে তাদের প্রয়োজন এই রান। ৬ উইকেট হাতে থাকলেও কতটা এগোতে পারবেন স্বাগতিকরা? বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা মেহেদী হাসান মিরাজের প্রত্যাশা, ‘আমরা তো চাইব যত কম রান হয়। এখনো খেলার দুই দিন বাকি আছে। আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আরও ৩টা উইকেট দ্রুত ফেলে দেওয়া। তারা সবাই ভালো ব্যাটিং করে এবং উইকেটটা এখন যত দিন যাচ্ছে, ভালো হচ্ছে। এ জন্য আমরা চাচ্ছি নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য না রেখে ধাপে ধাপে এগোতে।’
লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকলেও অস্ট্রেলিয়া এখনো ম্যাচ জয়ের আশা ছাড়েনি। তৃতীয় দিনের শেষভাগে আর কোনো উইকেট না হারিয়ে দিন পার করা তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির। নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে দলটির পেসার জশ হ্যাজলউড বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সবসময়ই ম্যাচ জেতা। আমরা সেশন ধরে ধরে এগোতে চাই। উইকেটের আচরণ যেমনই হোক, আমাদের কাজ হবে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং শেষ দিনে গিয়ে সুযোগ তৈরি করা। ম্যাচ জেতাই আমাদের মূল লক্ষ্য এবং আমরা সে অনুযায়ী নিজেদের সেরাটাদেওয়ার চেষ্টা করব।’
তবে অজিদের এই পরিকল্পনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবেন বাংলাদেশের বোলাররা। হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদের দাপটে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় দলটি। এরপর শান্তরা প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে। এই রান করতে সফরকারীরা ১৩৮ ওভার বল করে। গত সাড়ে সাত বছরে নিজেদের মাটিতে এত পরিশ্রম করেননি কামিন্সরা।
সব মিলিয়ে ২২৮ রানের লিড পায় বাংলাদেশ দল। এই বিশাল লিডের বড় অবদান লোয়ার অর্ডারের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের। সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেন মিরাজ। গতকাল ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশকে লাঞ্চের পরও টেনে নিয়ে গেছেন তিনি। সাতে নেমে ১৫৪ বলে ৬৫ রান করেন মিরাজ। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সাত নম্বর বা তার নিচে নেমে এটাই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। আগের দিন অপরাজিত হাসান মাহমুদ গতকাল দিনের চতুর্থ ওভারে হ্যাজলউডের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ১৪ রানে থামেন। মিরাজের সঙ্গে তার জুটি থেকে আসে ৪৬ রান। এরপর তাইজুল ইসলাম ২৩ বলে ১৭ রান করেন। হ্যাজলউডকে ফ্লিক করে মারা তার ছক্কাটির প্রশংসা করেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার জেসন গিলেস্পি। যদিও ওই ওভারেই বিদায় নেন তাইজুল।
এরপর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে মিরাজ অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের আরও পরীক্ষা নেন। নবম উইকেটে তাদের জুটি থেকে আসে ৪৬ রান। নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে স্ট্রাইক ধরে রেখে, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রান্ত বদলে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত এক ইনিংস খেলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া লেগ সাইডে ফিল্ডার ছড়িয়ে বাউন্সারের পরিকল্পনা করেও তাকে থামাতে পারেনি। একপর্যায়ে তাসকিনের সহজ ক্যাচ ছাড়েন স্টিভেন স্মিথ, মিরাজের একটি ক্যাচ নিতে পারেননি ট্রাভিস হেড। তবে মধ্যাহ্নভোজের পর প্রথম ওভারেই থামে তার লড়াই। ১৫৪ বলে ৬৫ রান করে হ্যাজলউডের শিকার হন তিনি। শেষ ব্যাটসম্যান ইবাদত হোসেন চৌধুরী ন্যাথান লায়নকে হাঁকানো বিশাল ছক্কার সাহায্যে ৮ রান যোগ করেন। তাকে ফেরানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ করেন হ্যাজলউড।
অস্ট্রেলিয়ার এ ডানহাতি পেসার চোট কাটিয়ে ১৩ মাস পর টেস্টে ফিরে একাই ৬ উইকেট নেন। তার পঞ্চম শিকারটি ছিল ৩০০তম টেস্ট উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন তিনি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, টেস্ট ক্রিকেটের দেড়শ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলের একাদশে চারজন বোলার খেলছেন, যাদের প্রত্যেকের ৩০০ বা তার বেশি টেস্ট উইকেট আছে। এই তালিকায় হ্যাজলউডের আগে ঢুকেছেন লায়ন, কামিন্স ও মিচেল স্টার্ক। এই বোলিং চতুষ্টয়ের বিপক্ষেই বাংলাদেশ করেছে ৪২৬ রান। যদিও একা কৃতিত্ব নিতে চাননি মিরাজ। বাংলাদেশের দলীয় পারফরম্যান্সের কথাই বলেন তিনি, ‘সবাই খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে এবং সবাই সবার দায়িত্ব পালন করছে। এভাবে দল হিসেবে পারফর্ম করতে পেরে ভালো লাগছে।’
পরে বল হাতেও স্বপ্নের মতো শুরু পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ওভারে হাসানের অসাধারণ এক ডেলিভারিতে রানের খাতা খোলার আগেই বোল্ড হন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড। পরে শরীরের কাছের বল কাট করতে গিয়ে স্টাম্পে টেনে আনেন ট্রাভিস হেড। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া সফরকারীর ডানহাতি পেসার আবারও অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা এলোমেলো করে দেন। ৩৭ রানে ২ উইকেট হারানোর পর মারনেস লাবুশেন ও স্মিথ কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। ৩৬ রানের জুটি ভাঙেন তাইজুল। ৫৯ বলে ৩১ রান করা লাবুশেনকে বোল্ড করেন তিনি। এরপর স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন মিলে আরেকটি জুটি গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৪৪ রানে মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন স্মিথ। অস্ট্রেলিয়া ১২২ রানে হারায় চতুর্থ উইকেট।
এরপর গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি প্রায় ১৬ ওভার উইকেটে টিকে থেকে দিন শেষ করেন। মাঝখানে তাসকিনের করা একটি বল গ্রিনের স্টাম্পে আঘাত করলেও বেল ফেলতে পারেনি। সে সৌভাগ্য নিয়েই অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত ৪ উইকেটে ১৬১ রান করে দিন শেষ করেছে। তবে স্বাগতিকদের সামনে এখন কঠিন হিসাব। ঘরের মাঠে প্রথম ইনিংসে ২০৬ রানের বেশি পিছিয়ে থেকে কোনো টেস্ট জেতেনি তারা। বাংলাদেশ সেখানে ২২৮ রানের লিড নিয়েছে। অর্থাৎ ডারউইনে ম্যাচ জিততে হলে অস্ট্রেলিয়াকেই গড়তে হবে নতুন ইতিহাস। তবে তাদের জন্য পথটা সহজ নয়। সহজ রাস্তাটা শান্তদেরই। ইতিহাস ডাকছে বাংলাদেশকে।