কথায় বলে ‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’। আমাদের ভোট বিশেষজ্ঞদের অবস্থা খানিকটা তাই। যে কোনো নির্বাচনের আগে-পরে, তারা প্রায় মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হন। প্রচুর কথা বলেন, ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কিন্তু ভোটের রেজাল্ট বের হলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মেলে না। একটু-আধটু যেটুকু মেলে, তা আমি বা আপনি বললেও মিলত। এ জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। তা ছাড়া আপনি যদি ১০টি কথা বলেন, তাহলে একটা-দুটো মিলবেই। কিন্তু সোফলজিস্টরা, যা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তার পেছনে বিজ্ঞান কতটা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তার কারণ এর আগের ভোটে গুরুগম্ভীর গলায় যা যা ভবিষ্যদ্বাণী স্বঘোষিত এ বিশেষজ্ঞরা করেছিলেন, তার অধিকাংশই ঠিকঠাক মেলেনি। ফলে জনমনে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে না ঠেকলেও কমেছে তা নিশ্চিত।
এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন দুই দফায় শেষ হতে না হতেই চ্যানেলে চ্যানেলে যে এক্সিট পোল হচ্ছে, তাতে মোটের ওপরে সবকটিতেই তৃণমূল কংগ্রেস হারতে চলেছে। এ রকম একটা আভাস স্পষ্ট। একাধিক নতুন নতুন সোফলজিস্ট সংস্থার সমীক্ষায় উঠে এসেছে এবার তৃণমূল কংগ্রেস ১২৫ থেকে ১৪০ অবধি আসন পেতে পারে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক চিত্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে। ২৯৪ আসনবিশিষ্ট বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে গেলে ১৪৮ আসন দরকার। সমীক্ষায় ম্যাট্রিজ বলছে তৃণমূল পেতে পারে ১২৫-১৪০ । বিজেপি ১৪৬-১৬১। অন্যান্য ৬-১০টি। পোল ডায়েরি দেখাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে ৯৯-১১০টি। অপরদিকে বিজেপির সিট বেড়ে হবে ১৪২-১৭১। পি-মার্কের হিসাবে তৃণমূল ১১৮-১৩৮ আর বিজেপি ১৫০-১৫৭ । প্রজাপোল অ্যানালিটিক্স তৃণমূল কংগ্রেসকে খুব বেশি হলে ৮৫-১১০ দিচ্ছে। অপরদিকে তাদের হিসাবে বিজেপি পেতে চলেছে ১৭৮-২০৮। চাণক্য স্ট্রাটেজিস তৃণমূল কে দিচ্ছে, ১৩০-১৪০ আর বিজেপি পাচ্ছে ১৫০-১৬০ । এসব বিশেষজ্ঞ বুথফেরত যে সমীক্ষার ভিত্তিতে আনুমানিক যে হিসাব-নিকাশ করছেন, তা অনেক সময়ই ঠিক হয় না। তার বড় কারণ জনগণের যে সামান্য অংশকে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করে সিদ্ধান্তেপৌঁছান, তাদের বড় অংশই সমীক্ষকদের বিভ্রান্ত করতে ভুল উত্তর দেন। ভোট হয়তো দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। কিন্তু বলছেন সবাই বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। গত লোকসভা নির্বাচনে গোদি মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত, একাধিক সংস্থা হাইপ তুলেছিল যে, নরেন্দ্র মোদি সরকার কমছে কম ৪০০ সিট পেতে চলেছে। আওয়াজ উঠেছিল ‘আব কি বার ৪০০ পার।’ আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফল ঘোষণার পর দেখা গেল, যাবতীয় মিথ, জল্পনা-কল্পনা, মোদি-ম্যাজিক মুখ থুবড়ে পড়ল। টেনেটুনে বিজেপি আড়াইশ সিটে আটকে গেল। পরিস্থিতির চাপে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনে, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্র বাবু নাইডু ও বিহারের নীতিশ কুমারের সহায়তা নিয়ে সংকট এড়ালেন কোনো রকমে। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সমীক্ষার দিকে একবার চোখ বোলান টাইমস নাও সেবার বিজেপিকে ১২৫ এবং বাম কংগ্রেস জোটকে ১৯ আসন দিয়েছিল। সেবার বিজেপি পেল ৭৭টি, বাম কংগ্রেস জোটের ভাঁড়ার ছিল শূন্য। রিপাবলিকের হিসাবে তৃণমূল কংগ্রেস ছিল ১২৮-৩৮ আর বিজেপি ১৩৮-১৪৮ । বাম কংগ্রেস ১১-২১ । বাস্তবে কি হয়েছিল তা আগেই বলেছি। এ রকম আরও একাধিক সমীক্ষা ধরে ধরে প্রমাণ করে দেওয়া যায়, ভোটপরবর্তী এক্সিট পোল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক ভবিষ্যৎ বলতে ব্যর্থ। খবরে সবরে যা মেলে, তা অনেকটাই ওই ফকিরের কেরামতির মতো। যার সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিতান্তই ক্ষীণ। তবু প্রতি বছর ভোট হতে না হতেই এই বুজরুকি চলতে থাকে। চ্যানেলে সম্প্রারিত ভোট নিয়ে স্বঘোষিত প-িতদের বেশিরভাগের সঙ্গে মাটির যোগ প্রায় নেই। ভোটের পরের কদিন উত্তেজনা জিইয়ে রাখলে, করপোরেট পুঁজির ব্যবসা বাড়ে বিজ্ঞাপনের দৌলতে। চ্যানেলের টিআরপি বাড়ে। কখনো সখনো মনে হয়, এর সঙ্গে বেটিং চক্রের কোনো যোগ নেই তো! থাকলেও আমি অন্তত অবাক হব না। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামশি কথিত অর্গানিক ইন্টেকচুয়ালদের কদর নেই। অথচ অন্তত ১০ জন তরুণ, যুবক বুদ্ধিজীবীর নাম বলতে পারি, যাদের বলা ও লেখা বিপুল সমৃদ্ধশালী। তাদের এসব নির্বাচনী অলোচনায় নিয়ে এলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, অর্থনীতি তো বটেই নির্মোহ এক সমাজচিত্র লোকে পেতে পারেন। কয়েক বছর ধরে তৃণমূল রাজত্বকালে মেধার অবনয়ন ও দলীয়করণ যে হয়েছে তা নিশ্চিত। বাম আমলেও ছিল। সব ক্ষেত্রেই দলীয়করণ। কিন্তু কবছরে তা মারাত্মক চেহারা নিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস গণতান্ত্রিক যাবতীয় পরিসর সঙ্কুচিত করেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর বিকল্প কোনো হিসেবেই বিজেপি হতে পারে না। বাবরি মসজিদ ভাঙা বা গুজরাট গণহত্যার মধ্য দিয়ে যে দলটির ক্ষমতায়ন, তারা আর যাই হোক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, এটা বোধহয় তাদের অনুরাগীরাও বিশ্বাস করেন না। দলটির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে যে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। এবারের ভোটে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে খোলাখুলিভাবে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে, তা আগে কখনো হয়েছে বলে মনে করতে পারছি না। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গাইঘাটা অঞ্চলে এক বৃদ্ধকে লুঙ্গি পরে আসায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ভোট দিতে দেননি। পরে বাধ্য হয়ে সেই বৃদ্ধ নাতির প্যান্ট পরে ভোট দেন।
পোশাক, ভাষা ইদানীং ‘দুষ্কৃত’ চিহ্নিত করার উপাদান হয়ে যাচ্ছে। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কি হতে পারে? পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এবার আশ্চর্যজনকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্নীতি, শিল্প, রোজগার সব পেছনে ফেলে নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে অনুপ্রবেশ এবং ওপারের একটি জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন। মজা হচ্ছে এই ইস্যুতে বিজেপির সুরে সুর মেলাতে, বামপন্থি কিছু দলও পিছিয়ে নেই। ভয়টা হচ্ছে আমরা কীভাবে যেন রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ১৯৪৬-৪৭ এ পৌঁছে গেছি। গ্রাম, মফস্বল এবং অবশ্যই শহরের এলিট অন্দরে সব পরিচয় ছাপিয়ে আমরা ক্রমেই নিছক হিন্দু-মুসলমান হয়ে গেছি। মিথ্যে প্রচারের ঢক্কানিনাদে স্বয়ং গোয়েবলস সাহেব মুখ লুকিয়ে পালাতে পারলে বাঁচেন। এই কাজে মিডিয়ার ভূমিকা কম নয়। নিরাপত্তার ‘স্বার্থে’ উত্তর বুলডোজার প্রদেশ থেকে এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট এক পুলিশ অফিসারকে আনা হয়েছে। মিডিয়া তাকে নিয়ে যে চিত্রকল্প নির্মাণ করছে, তা তৃতীয় সারির হিন্দি সিনেমাকে হার মানাবে। অপরাধজগতের ডেরায় এক দুর্দান্ত সাহসী পুলিশ অফিসারের সদর্পে পদচারণা। ডেরার খলনায় কেররা বলাবাহুল্য নির্দিষ্ট এক সম্প্রদায়ের। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন, সাদা কালোয় ভাগ হয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠী এবার নির্বাচনের কুশীলব। দীর্ঘদিন ধরে সযতেœ লালিত এই আখ্যান নির্মিত হয়েছে ভোটের স্বার্থে, শাসকদের প্ররোচণায়। ভোট মিটে গেল। রেজাল্ট বের হবে কয়েক দিন বাদে। নিশ্চিত কেউ জিতবে অথবা হারবে। কিন্তু দগদগে যে ক্ষত তৈরি হলো, তার নিরাময় কীভাবে হবে বা আদৌ হবে কিনা, জানি না। বিজেপি এবার সর্বশক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ জয় করতে ঝাঁপিয়েছে। লাখ লাখ নাগরিককে ভোটদান থেকে বিরত করে, কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে এজেন্সি সব শক্তি মিলেমিশে সে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বাংলাকে ফেরাতে চাইছে। আমাদের চেনাজানা, খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীরা সব জেনে বুঝেও নীরব থেকে গেলেন। এও কম দুঃখের নয়।
একটা চালু কথা আছে যে, কাক কাকের মাংস খায় না। বুদ্ধিজীবী না, একটু-আধটু যা ছবি-টবি করি, লিখিও অল্পস্বল্প। চিনি অনেক কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিককে। ওপর দিকে থুতু ছুড়ব না। কিন্তু আমার রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশের ক্লীবতা ভীষণ লজ্জা দেয়। প্রতিষ্ঠানকে তৈলমর্দন অনেকের স্বভাবের মধ্যে ঢুকে গেছে। কোনো রকমে ছুটকোছাটকা এক আধটা পুরস্কার পেলেই তারা কৃতার্থ হয়ে যান। অথচ এ রাজ্যে এখনো কতশত তরুণ কত চমৎকার লিখছেন, নাটক, সিনেমা করে চলেছেন। এই তো সেদিন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় অকালে চলে গেলেন। কখনো মাথা ঝোঁকাতে দেখিনি। সৌম্য মন্ডলের লেখা নিয়ে ক্যাকটাসের সিধু শাসকের লাল চোখের পরোয়া না করে গান গাইলেন। কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখে যাচ্ছে অত্রি, সৌরভ সাকিব, সোমনাথ রায়েরা। আজও এই শহরে চির তরুণ শমিক বন্দ্যোপাধ্যায় রক্ত করবী নিয়ে যখন বলতে থাকেন, হলভর্তি জনতা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অক্লেশে এ শহরকে বস্তির শহর বলে যান, গণ্যমান্য বুদ্ধিজীবী তখনো নীরবে তা শুনেন। মিডিয়ার টকশোতে হেভিওয়েট নাগরিকরা, শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য সোচ্চারে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ দেন। তাদের হয়তো চোখ এড়িয়ে যায় আপাত তুচ্ছ খবরটা যেখানে বলা আছে, কেন্দ্রীয় বাহিনীর অযথা ধাক্কায় ভোট দিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে অশতিপর এক বৃদ্ধের। নজর এড়িয়ে যায়, লাখ লাখ ভোটের তালিকা থেকে বাদ পড়া সহনাগরিকদের পাংশু, বিবর্ণ মুখ। কিংবা নির্বাচন কমিশনের নিদানে আত্মহননে বাধ্য হয়ে কতশত মানুষের নাম মনেও পড়ে না। ভোট আসে ভোট যায়। শাসকের বদল হয় অথবা হয় না। সমাজের অন্ধকারের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
লেখক : প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
