শিকড় থেকে শিখরে

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২ এএম

দেশের রাজনীতিতে যেসব নেতা ধৈর্য, সংগ্রাম এবং কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের অন্যতম। তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন সর্বোচ্চ শিখরে। ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে ছিলেন শিক্ষক, রাজনৈতিক জীবনে হয়েছেন সুপরিচিত নেতা। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে প্রতিমন্ত্রী দিয়ে মন্ত্রিত্বের অধ্যায় শুরু। সবশেষ হয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী। এবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে যাচ্ছেন বঙ্গভবনে।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল। বর্ণাঢ্য জীবনে শিক্ষকতা পেশা একটি পর্যায়ে ছেড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বেছে নেন রাজনীতির বন্ধুর পথ। রাজনীতির মাঠে কর্মী থেকে নেতা, এরপর পৌরসভার চেয়ারম্যান, সেখান থেকে সংসদ সদস্য-মন্ত্রী এবং অবশেষে দেশের রাষ্ট্রপতি আসনে বসতে যাচ্ছেন বর্ষীয়ান এই ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে গতকাল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। একজন ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের জন্য বিএনপির এই মনোনয়ন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

মির্জা ফখরুলের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন এবং মা মির্জা ফাতেমা আমিন। মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি দুইবার পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য এবং বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন তিনি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠার পাশাপাশি শৈশব-কৈশোর থেকেই সমাজ ও সংস্কৃতির নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণের পর ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। পাকিস্তান পর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ে সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনে নাট্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মঞ্চে অভিনয় করেছেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন তিনি। পরবর্তী ধাপে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে পুরোদমে রাজনীতিতে নামেন তিনি। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে জিতে হন চেয়ারম্যান। রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিভিন্ন সময়ে হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন কয়েকবার। রাজপথের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্যে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বঙ্গভবনে তার বৈঠক ও উপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা যোগ করে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে বা জাতীয় সংকটকালে রাজপথের নেতা হিসেবে বঙ্গভবনে গিয়ে দলের ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তখনকার উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর একান্ত সচিব হন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি, পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসেন। ২০১১ সালে তখনকার মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে সংগঠিত রাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। সেই থেকে গতকাল পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের কারণে দলীয় পদ ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে আসার আগে মির্জা ফখরুল দলটির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি এবং পরে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন দীর্ঘদিন। রাজনীতির মাঠে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ যাত্রা পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন থেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দমনপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হন।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে তখনকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল থেকে প্রায় দুবছর কারাগারে ছিলেন। এরপর অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে লন্ডন যান। এরপর সেখান থেকেই তিনি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে দেশে থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে দলকে সুসংগঠিত রাখেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এজন্য তাকে তিনবার কারাগারেও যেতে হয়। বিএনপির সংকটে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে দেশের ভেতরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দৃশ্যমান মূল নেতৃত্বে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের ১৭ বছরে মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে ৯৮টির মতো মামলা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক জনসভায় তিনি নিজেই মামলার এই সংখ্যা উল্লেখ করেন। এসব বেশির ভাগ মামলা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা দেওয়া, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে। তার বিরুদ্ধে থাকা বেশির ভাগ মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে অথবা শুনানির প্রক্রিয়ায় আছে। কিছু মামলা থেকে তিনি অব্যাহতিও পেয়েছেন।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হলেও বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে সারা দেশে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি মহাসচিব সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম। দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ মির্জা ও মির্জা সাফারুহ। স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে গেছেন। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বড় মেয়ে সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত