তিনি ঘুষ নেন, দানও করেন!

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জমি, বাড়ি, কলকারখানাসহ বিপুল অর্থবৈভবের মালিক হয়েছেন। করেছেন স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসাও। বিপদ-আপদে মানুষকে নানাভাবে সহায়তা করেন বলে স্থানীয়রা তাকে ‘দানবীর’ প্রকৌশলী হিসেবে চিনেন। সেই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বছরখানেক আগে এই অনুসন্ধান শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি, চলছে ধীরগতিতে। ফাইল নড়ছে না, পড়ে আছে আলমারিতে। কবে নাগাদ অনুসন্ধান শেষ হবে, তা নিশ্চিত নন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিজেই।  

দুদকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে ডিপিডিসির প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। অভিযোগে বলা হয়, আব্দুর রাজ্জাক তার নিজের এলাকায় গড়েছেন সুদৃশ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা। ঢাকা ও শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদের সঙ্গে রয়েছে রাজধানীর পাশর্^বর্তী সাভারের ভাকুর্তায় ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড নামে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন তৈরির কারখানা। দুদক অভিযোগ পাওয়ার পর ওই বছরের ৭ মে অনুসন্ধানে নামে। সংস্থাটির উপপরিচালক নাজমুল হাসান ও উপসহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত টিম অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেনি। এদিকে দুদকের অনুসন্ধান টিম চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীর নামে কী কী স্থাবর সম্পদ আছে, জানতে চেয়ে রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৫ মার্চের মধ্যে সব রেকর্ডপত্র দুদকের কাছে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আব্দুর রাজ্জাকের অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান। তাকে অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুসন্ধান টিম একাধিকবার তলবি নোটিস পাঠিয়েছে। কিন্তু তিনি দুদকের ডাকে সাড়া দেননি। এখন অনুসন্ধান টিম পুনরায় রেকর্ডপত্র চেয়ে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রেকর্ডপত্র দুদকে আসতে শুরু করেছে। সব রেকর্ডপত্র পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান টিম কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে। যার ভিত্তিতে কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি এখন ডিপিডিসির প্রধান কার্যালয়ের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা-২০০৭-এর সংশোধনী ২০১৯-এর ৭ ধারায় বলা আছে কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরুর নির্দেশ দেওয়ার পর ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান সম্পন্ন করে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব না হলে অনুসন্ধান কর্মকর্তা আরও ৩০ কার্যদিবস সময় চেয়ে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ অনুসন্ধান কর্মকর্তা অভিযোগের অনুসন্ধানে মোট ৭৫ কার্যদিবস সময় পাবেন। আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধান ২০২৫ সালের ৫ মে শুরু হয়। প্রায় এক বছর হয়ে গেলেও  তা শেষ করতে পারেনি দুদকের অনুসন্ধান টিম। কবে নাগাদ এ অনুসন্ধান শেষ হবে তাও জানা নেই টিমের।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, আব্দুর রাজ্জাকের বাড়ি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হাসলিগাঁও গ্রামে। বিপুল অর্থের মালিক আব্দুর রাজ্জাক নিজের গ্রামে প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর দোতলা বাড়ি বানিয়েছেন, বাড়ির সামনে নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন দোতলা মসজিদ, তার পাশে মাদ্রাসা ও এতিমখানা। বাড়ির কাছে গড়েছেন মাছের খামার। স্থানীয় তিনআনি বাজারে বহুতল বাড়ি ও একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান করেছেন, যেটি তার বড় ভাই পরিচালনা করছেন। তার রয়েছে ঢাকা ও শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন প্রকল্পে দুটি বহুতল বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি। রয়েছে সাভারের ভাকুর্তায় ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড নামে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন তৈরির কারখানা। আব্দুর রাজ্জাক নিজ এলাকায় স্থানীয় জনসাধারণের কাছে দানবীর হিসেবে পরিচিত। ডিপিডিসির একজন প্রকৌশলী সরকারিভাবে যে বেতন পান, তাতে শতকোটি টাকার মালিক হওয়ার সুযোগ নেই।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আব্দুর রাজ্জাকের শেরপুর শহরের নওহাটা এলাকায় শেরপুর ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সিস্ট) এবং সিসকো ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অ্যান্ড টেকনোলজি নামের দুটি পলিটেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শেরপুর পৌর এলাকার দীঘারপাড়ে ৬ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বিশাল মৎস্য খামার। শেরপুর বাসস্ট্যান্ড ও রঙমহল এলাকায় দুটি বাড়ি ছিল, যা ইতিমধ্যে তিনি বিক্রি করে দিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এ ছাড়া গাজীপুর সদরে তার একটি বহুতল বাড়ি রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ডিপিডিসির বদলি, পদোন্নতিসহ ডিপিডিসির প্রায় সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার নিজ জেলা শেরপুর কিংবা ময়মনসিংহ বিভাগের কোনো অনুষ্ঠান হলেই ডিপিডিসির অনেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীদের থেকে বড় অঙ্কের চাঁদা আদায় করতেন।

অভিযোগে বলা হয়, আব্দুর রাজ্জাক ডিপিডিসির মগবাজার ডিভিশনে উপসহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে বিশেষ পদ্ধতিতে ম্যানেজ করে দুই ধাপ টপকে সরাসরি সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে সাভারের ভাকুর্তা এলাকায় প্রায় ৩০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করেন ওশাকা পাওয়ার লিমিটেড নামে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন তৈরির কারখানা। বিদ্যুতের উচ্চ চাপের সংযোগ পেতে হলে তার কোম্পানির তৈরি সরঞ্জাম নেওয়া এক প্রকার বাধ্যতামূলক ছিল। তার কোম্পানির সাব-স্টেশনের সরঞ্জাম নিতে না চাইলে, সেই গ্রাহককে নানা হয়রানির মধ্যে পড়তে হতো। ডিপিডিসির এ কর্মকর্তা বেশি দামে নিম্নমানের সাব-স্টেশন কিনতে গ্রাহককে বাধ্য করতেন। তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলে ডিপিডিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশে অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু প্রধান অভিযুক্ত প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তদন্ত কমিটির প্রধানকেই পড়তে হয় ভোগান্তিতে। প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল সিনিয়র হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করলেও পরে তাকে বঞ্চিত করে জুনিয়র একজনকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। প্রকৌশলী রাজ্জাকের সিন্ডিকেট মাতুয়াইল, জুরাইন, শ্যামপুর ও কাজলা এলাকায় গ্রাহকদের তার সোলার প্যানেল নিতে বাধ্য করত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সাব-স্টেশন তৈরির কারখানা কাঠের দরজা তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়েছেন তিনি।

অভিযোগে বলা হয়, রাজধানীর পান্থপথের ১৫২/২/এম (৩য় তলা) ঠিকানায় করপোরেট অফিস করে ওসাকা পাওয়ার লিমিটেডসহ অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনা করেছেন আব্দুর রাজ্জাক। তার দ্বিতীয় স্ত্রী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৌশলী রাজ্জাক তার কারখানার তৈরি নিম্নমানের ট্রান্সফরমার বিভিন্ন প্রকল্পে সরবরাহ করেন। ২০১৬ সালের জুন মাসে একটি প্রকল্পে ওশাকা পাওয়ার লিমিটেডের তৈরি ৩০০ ট্রান্সফরমার মানহীন বলে অভিযোগ উঠলে প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ট্রান্সফরমারে বিল আটকে দেন। এরপর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ৩০০ ট্রান্সফরমারের মধ্যে ১৯১টিই মানহীন হিসেবে ধরা পড়ে। ডিপিডিসিতে মানহীন ট্রান্সফরমারের কারণে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি নানা দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও বাড়ে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত