ব্যবসার বৈধতা পেলেন ঢাকার হকাররা

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

রাজধানীতে ব্যবসা করার বৈধতা পেলেন হকাররা। এখন থেকে নির্দিষ্ট জায়গা ও নির্দিষ্ট ডিজাইনের ভ্রাম্যমাণ ট্রলির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন তারা। এ লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ডিজিটাল আইডি কার্ড দেওয়া শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সড়ক ও ফুটপাতে বসা হকারদের যাচাই-বাছাই করে পুলিশের পক্ষ থেকে তৈরি করা তালিকা অনুসারে এই কার্ড দেওয়া হচ্ছে।

নির্দিষ্টসংখ্যক হকারকে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার বৈধতা দেওয়ার মাধ্যমে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কে একটা শৃঙ্খলা আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সড়ক ও ফুটপাতে পথচারীরা নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারবে। অন্যদিকে, হকাররাও নির্বিঘেœ চাঁদা প্রদান এবং উচ্ছেদের ভয় ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। এই উদ্যোগের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে পুরো ঢাকার সড়ক ও ফুটপাত হকারমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ কাজে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আলাপকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হকাররা সড়ক থেকে যেতে চায় না। তাদেরকে অনেক বুঝিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করছি। তাদের যুক্তি হলো, বছরের পর বছর এক জায়গায় ব্যবসা করছে, এখান থেকে চলে গেলে ব্যবসা নষ্ট হবে। মিরপুরের হকারদের সঙ্গে একটি সমাবেশের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে প্রশাসক বলেন, তারা এমন সব শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, যা মানা সম্ভব নয়।

শফিকুল ইসলাম খান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে মানবিক কারণে হকারদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে কেউ চৌকি নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। নির্দিষ্ট ডিজাইনের ট্রলি থাকবে, ট্রলিতে করে মালামাল বিক্রি করবে। তাদের সবার রেজিস্ট্রেশন থাকবে, কেউ নিয়ম ভঙ্গ করতে পারবে না।

তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণে হকারদের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ না করে বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। হকারদের এমন জায়গায় বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে যানজট না হয়। তবে এই পরিচয়পত্র স্থায়ী বন্দোবস্ত নয় উল্লেখ করে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘এর জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। ভবিষ্যতে হকার্স মার্কেটের ব্যবস্থা করা হবে। তবে আগের জায়গায় আর কেউ বসবে ন।’

রাজধানীবাসীর অন্যতম দুর্ভোগের কারণ হকারদের ফুটপাত ও সড়ক দখল। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়ক এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে হকার নেই। চলাচলের জায়গা দখল করে হকারদের ব্যবসার কারণে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘœ ঘটছে। নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার পর আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা নিয়ে ব্যবসা করতে হয় হকারদের। কয়েকদিন পরপর হকার উচ্ছেদের নামে চলে চোর-পুলিশ খেলা। নেপথ্যে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট জড়িত থাকায় কখনোই ফুটপাত ও সড়ক হকারমুক্ত করা সম্ভব হয় না।

অতীতের কোনো সরকারই হকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। এমনকি ফুটপাত পাহারা দেওয়ার জন্য বিশেষ বাহিনী নিয়োগ করেও এই কাজে সফল হওয়া যায়নি। এ ছাড়া হকার পুনর্বাসনের জন্য মার্কেট নির্মাণ ও ভ্রাম্যমাণ গাড়ি দেওয়া হয়েছে একাধিকবার। নির্দিষ্ট নীতিমালা না করায় এবারের উদ্যোগ নিয়েও নানা সংশয় প্রকাশ করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হকারদের অবশ্যই ডিজিটাল আইডি কার্ড থাকতে হবে। এটি বায়োমেট্রিক হলে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে। এতে করে একজনেরটা আরেকজন ব্যবহার করতে পারবে না। তিনি জানান, ঢাকার সড়কে এত পরিমাণ হকার ব্যবসা করে, যাদের সবাইকে ব্যবসার স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তাদের তালিকা করে বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তাও করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, হকার সমস্যা সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে হবে, ডিটেইল পরিকল্পনা কী তা স্পষ্ট করতে হবে। এ ছাড়া কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ তো কখনো সফল হয়নি, হবেও না। তাই হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে। মুখের কথায় এত বড় কর্মযজ্ঞে স্থায়ী সফলতা পাওয়া কঠিন।

পরিচয়পত্র প্রদান অনুষ্ঠান

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থা দুটি নিজ নিজ নগর ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু করে। এই পরিচয়পত্রে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের বৈধতা দেওয়াসহ বসার স্থান নির্ধারণ করা রয়েছে।

গুলশান নগর ভবনে এক অনুষ্ঠানে ২০২ জন হকারের মধ্যে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বিতরণ করেছে ডিএনসিসি। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই ২০২ জনের মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে এবং বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচাবাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত মোট হকারের সংখ্যা ৮২৯ জন। বাকি হকারদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র প্রদান করে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করা হবে।

অনুষ্ঠানে হকারদের নির্ধারিত স্থানের বাইরে ব্যবসা না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যবসায় করতে দেওয়া জায়াগায় স্থায়ী কোনো কাঠামো নির্মাণ না করতে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, একটি মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে স্থানান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কমিটিতে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) যুক্ত থাকবে।

ডিএসসিসি প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত কয়েকটি এলাকার হকারদের মধ্যে পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু করেছে। এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলিস্তানের রমনা ভবনের লিংক রোডে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), মতিঝিল ইসলাম চেম্বারের সামনে ও আশপাশের এলাকায় সান্ধ্যকালীন মার্কেট (সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১০টা), রাজউক ভবনের পেছনে: দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, বায়তুল মোকাররম পূর্ব গেট সংলগ্ন লিংক রোড, দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেট সংলগ্ন এক পাশে দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেট, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠসংলগ্ন রাস্তায় দৈনন্দিন ডে টু ডে মার্কেটে হকারদের বসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সংস্থাটি।

গতকাল বিকেলে হকারদের নিয়ে আয়োজিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ১০০ হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সব হকারকে প্রদান করা হবে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া  ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে।’

তিনি  বলেন, হকার বসার পরও ফুটপাতে পথচারীর চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা ঢাকা শহরে হকার ব্যবস্থাপনা শুরু করেছি। এর ফলে একদিকে নিরাপদ ও পথচারীবান্ধব ফুটপাত নিশ্চিত করা ও সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে হকার নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হবে।

এই উদ্যোগ মানবিক ও যুগান্তকারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।’

পুনর্বাসনের পর সরকার ও সিটি করপোরেশনের সব বিধিবিধান মেনে এবং বরাদ্দকৃত জায়গার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে বৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি হকারদের প্রতি আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার এবং ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত