শ্রমিক জাগরণের দিন আজ

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৫:৫৬ এএম

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে আজকের দিনটি যেন নতুন করে উচ্চারণ করবে মানুষের শ্রম, ঘাম আর আত্মমর্যাদার গল্প। মহান মে দিবস আজ। দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়; বরং ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা প্রতিবাদের ধ্বনি, ন্যায্যতার দাবি আর মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতীক।

কারখানার শব্দ, নির্মাণশ্রমিকের হাতুড়ির আঘাত কিংবা প্রবাসী শ্রমিকের নিঃশব্দ ত্যাগ সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের অগ্রযাত্রা। এই দিনটি তাই উদযাপনের চেয়ে বেশি। এটি স্মরণ, সংহতি এবং নতুন করে শপথ নেওয়ার সময়; যেখানে শ্রমিকের ঘাম শুধু উৎপাদনের উপকরণ নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে; কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি এখনো সমান প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমিকের ঘামঝরা পরিশ্রম। তৈরি পোশাক খাত, নির্মাণশিল্প, কৃষি কিংবা প্রবাসী শ্রম সবখানেই শ্রমিকরা দেশের ভিত্তিকে মজবুত করে চলেছেন। তবে এই সাফল্যের আড়ালে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ আর বঞ্চনা। এখনো শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।

মে দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। এই প্রতিপাদ্যের অন্তর্নিহিত প্রেরণাকে ধারণ করেই বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।

১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওই দিন তাদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় নেমে আসে ৮ ঘণ্টায়। অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এ দিনকে তখন থেকেই সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। মে দিবসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০ দেশে জাতীয় ছুটির দিন।

রাষ্ট্রপ্রতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ‘এক গৌরবোজ্জ্বল দিন’ বলে মন্তব্য করেছেন। গতকাল এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস পালিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রমজীবী মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’

“শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’ সময়োপযোগী হয়েছে বলে আমি মনে করি।”

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের কল্যাণে যুগান্তকারী নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে পেনশন ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, বন্ধ শিল্প চালু, ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ, স্থায়ী শ্রমিক ও কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানান কর্মসূচি ও নীতিগ্রহণ করেছে।’ এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, আজকের এই দিনে আমি দেশে-বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশের সব শ্রমজীবী-কর্মজীবী ভাইবোন, যারা জীবন-জীবিকার জন্য সর্বোপরি দেশের উন্নয়নের জন্য, কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।

তারেক রহমান বলেন, ‘শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবন মানোন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার। আমি মনে করি, শ্রমবান্ধবনীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।’

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন শ্রমিকের দুটো হাত রাষ্ট্র ও সমাজের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের চাবিকাঠি। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণের কথা ভেবেই শহীদ জিয়া নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তার প্রবর্তিত নীতি ও সংস্কার শ্রমিক কল্যাণের ভিতকে শক্তিশালী করেছে। বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, শ্রমবাজার তৈরি করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেই প্রবাসী শ্রমিকরা বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। বিএনপি সরকার যতবার ক্ষমতায় এসেছে, শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের কল্যাণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।

‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের ধারাবাহিকতায় শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার সমুন্নত রাখা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব এবং অগ্রাধিকার,’ যোগ করেন তিনি।

বর্তমান সরকার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ঈদুল ফিতরে দেশের সব শ্রমিকের বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধাদি সময়মতো পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বর্তমান সরকার। ভবিষ্যতেও একই ধারা অব্যাহত রাখতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সচেষ্ট। নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা করে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও নারী-পুরুষ সমান মজুরি নিশ্চিত করতেও সরকার বদ্ধপরিকর। প্রবাসী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষাসহ নানাবিধ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

রাজধানীতে আজ শ্রমিক সমাবেশ থাকবেন প্রধানমন্ত্রী : আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ঢাকার নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আজ শুক্রবার দুপুরে শ্রমিক সমাবেশ করবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই কর্মসূচির মাধ্যমে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজধানীতে প্রথম সমাবেশে ভাষণ দেবেন তিনি। সমাবেশে লাখো শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতির প্রত্যাশা করছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশ সংকটে থাকলেও নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো সরকার পূরণ করবে। শ্রমজীবী মানুষের যে সমস্যা, তা আইন ও বিধিমালা করে সমাধান করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে এসব প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, এবারের মে দিবস একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ন্যূনতম মজুরির জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা না হওয়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো শ্রমজীবী মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সরকারি পদ বিলুপ্ত করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ায় শ্রমের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি পাটসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশীয় শিল্পের পরিবর্তে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

তিনি জানান, শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কাজের পরিবেশ, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হবে এই সমাবেশ থেকে।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে। তাই ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে জাতীয় নিম্নতম মজুরি বোর্ডকে আরও কার্যকর করার দাবি জানানো হবে। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের অন্যান্য সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সফু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক দলের আহ্বায়ক সুমন ভুঁইয়া, বদরুল আলম সবুজ প্রমুখ।

আরও কর্মসূচি : দিনটি পালনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি। মহান মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে।

দিবসটি পালনে রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিকেলে সমাবেশ করবে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত