হাওরে কৃষকের সর্বনাশ

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

উৎসবের আবহে শুরু হয়েছিল হাওরের ধান কাটা। তবে উৎসব মিলিয়ে যেতে সময় নেয়নি। এখন হাওরে আনন্দ নেই, আছে শুধু কৃষকের আর্তনাদ ও চোখের নোনাজল। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর বন্যায় তলিয়ে গেছে শত শত কৃষকের কষ্টের ফসল। হাওরজুড়ে এখন শুধুই হাহাকার। এ অবস্থায় তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সংকট। একদিকে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যারা কোনোরকমে ধান কাটছেন, তারা বাজারে দাম পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাবে প্রতি মণ ধানের দাম কমেছে অন্তত ২০০ টাকা।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তিন মাসের সহযোগিতা প্যাকেজ তৈরির কাজ শুরু করেছে সরকার। জানা গেছে, প্রথম মাসে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে দেওয়া হতে পারে সাড়ে ৭ হাজার টাকার সহযোগিতা।

কৃষি বিভাগ বলছে, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরভুক্ত ৭টি জেলায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাটা হয়েছে অর্ধেক ধান। হাওরভুক্ত জেলাগুলোর ৬টি জেলার অন্তত ১৭ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। তারা বলছেন, ক্ষতি শুধু কৃষকেরই নয়, এটা খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। অতীতের উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, ২০১৭ সালে বন্যায় হাওরের প্রায় ২০ লাখ টন ধানের উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়েছিল। ফলে ভোক্তাকে ওই সময় সারা বছর চড়া দামে চাল কিনতে হয়েছে। জানা গেছে, প্রতি বছর বোরো মৌসুমে সোয়া দুই কোটি টন চাল উৎপাদন হয় যা সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখে। এই উৎপাদনের ২০ শতাংশের বেশি আসে হাওর থেকে।

হাওরাঞ্চলের কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যা এবং বজ্রপাতের কারণে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পানির নিচে পাকা ধান থাকলেও তা কাটতে সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা। আর শ্রমিক মিললেও তারা প্রতি কাঠা জমির ধান কাটতে পারিশ্রমিক দাবি করছেন এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধান শুকানোর জায়গার অভাব ও ধানের দাম পড়ে যাওয়া। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে যেখানে প্রতি মণ ধান ৭শ থেকে ৮শ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ৫ থেকে ৬শ টাকায়।

নেত্রকোনা জেলার কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার ১৩০টির বেশি হাওরের ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। যার মধ্যে এখন ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে। জেলার আটপাড়া উপজেলার বাগরার হাওরের কৃষক সেলিম মিয়া দুই একর জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। এক একর জমির ধান ঘরে তুললেও বাকি ধান পানির নিচে তলিয়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেটুকু কাটছি তারও দাম নাই।’ শ্রমিক না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধান কাটছেন জেলার মদন উপজেলার কৃষক শাহজাহান মিয়া। ২৮ শতাংশ জমিতে ধান আবাদ করলেও পুরোটাই এখন পানির নিচে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটুকুই সম্বলসবটাই এখন পানির নিচে।’

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘উজানের ঢলে হঠাৎ পানি বাড়ায় নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান জলমগ্ন হয়েছে। নতুন করে বৃষ্টি না হলে এবং পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি।’

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে সুনামগঞ্জে এখনো অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। তবে টানা চার দিন বৃষ্টির পর রোদ ওঠায় গতকাল স্থানীয় কৃষকরা কাটা ধান ও মাড়াইয়ে কিছুটা সুবিধা পেয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, সুনামগঞ্জে গত বুধবার সকাল ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে আট মিলিমিটার। এ সময় সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছিল ২২ মিলিমিটার। তখন সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল ৫৬ সেন্টিমিটার। পাউবো আরও জানায়, ঢল নামা অব্যাহত থাকায় শুধু সুরমা নয়, জেলার কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, যাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ সব নদ-নদীর পানিই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলার হাওরগুলোতে কৃষকরা ধান কাটতে পারছেন না। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাওরে ১৩ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ফসল। তবে কৃষি বিভাগের এই হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন কৃষকের পক্ষে থাকা হাওর আন্দোলনের সদস্যরা। তারা বলেছেন, ‘এই হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার মিল নেই। জলাবদ্ধতা ও সর্বশেষ পানিতে তলিয়ে হাওরে থাকা প্রায় ৫০ ভাগ ধানের ক্ষতি হয়েছে।

এদিকে কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এখনো হাওরের অর্ধেক ধান জমিতে রয়েছে। এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। মঙ্গলবার পর্যন্ত কাটা হয়েছে এক লাখ ৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর। এর মধ্যে হাওরের নিচু অংশে ৭০ ভাগ এবং উুঁচ অংশে ১৩ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিত্রও একই। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন বর্গাচাষি ও ঋণ করে আবাদ করা কৃষকরা। একদিকে ধান কাটায় সংকট, অন্যদিকে দাম কমে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। শুধু হাওরেই নয়, এবারে অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বন্যার প্রভাবে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই ধানের আবাদ ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে মাঠের চিত্র ও কৃষি বিভাগের তথ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হলেও কৃষি বিভাগ তা কমিয়ে দেখাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাওরভুক্ত ৬টি জেলার ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১৭ হাজার হেক্টর। অনেকে পানির মধ্যেই ধান কাটছেন। এসব বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত ক্ষতির হিসাব করা হবে।’

এদিকে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বুধবার জাতীয় সংসদে এই সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানান তিনি। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্তদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ, আয়ের অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এই সহযোগিতা প্যাকেজ তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রথম মাসে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত একেকজন কৃষককে সাড়ে ৭ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেননেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত