হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় চলমান বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চা শিল্পে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এ অঞ্চলের ৫টি বড় চা বাগানসহ মোট ২৩টি বাগানে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাগান মালিক ও শ্রমিকরা পড়ছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মাধবপুরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো দিনে ৫-৬ ঘণ্টা, আবার কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। এতে চা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো—উইদারিং (পাতা শুকানো), রোলিং (মোচড়ানো) এবং ড্রায়িং (চূড়ান্ত শুকানো) ঠিকভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা চা পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চা পাতা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত না করলে তা দ্রুত গুণগত মান হারায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে এই প্রক্রিয়া বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এর ফলে উৎপাদিত চায়ের মান কমে যাচ্ছে এবং বাজারমূল্যও হ্রাস পাচ্ছে। অনেক বাগান কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে কাঁচা পাতা ফেলে দিচ্ছেন, যা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জগদীশপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক মনির হোসেন বলেন, আমাদের চা উৎপাদন পুরোপুরি সময়নির্ভর একটি প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময়ে পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে তার মান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা প্রায়ই মাঝপথে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছি। জেনারেটর চালানোর বিকল্প থাকলেও ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা কাঁচা পাতা সংগ্রহ করেছি কিন্তু তা প্রক্রিয়াজাত করতে না পেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, শ্রম ও সময়—সবকিছুই অপচয় হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে চা শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা প্রতিদিনই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। সরকার যদি দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে, তাহলে এই খাত মারাত্মক সংকটে পড়বে।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের ম্যানেজার শামসুল হক ভূঁইয়া বলেন, চা শিল্প একটি শ্রমনির্ভর খাত এবং এর প্রতিটি ধাপ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে যায়। এতে শুধু উৎপাদন কমে যাচ্ছে না, শ্রমিকদের নিয়মিত কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
চা উৎপাদন ব্যাহত হলে শ্রমিকদের রেশন ও বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। একটি চা বাগান পরিচালনা করতে প্রতিদিন বিপুল ব্যয় হয়। কিন্তু উৎপাদন না থাকলে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। যদি এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে অনেক বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই চা শিল্পকে বাঁচাতে হলে দ্রুত বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি।
তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটন বলেন, “বর্তমানে চা শিল্প টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু বাজারে চায়ের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। এর মধ্যে আবার দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে, যা আমাদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদ্যুতের সঙ্গে চা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ সরাসরি জড়িত। বিদ্যুৎ না থাকলে মেশিন চালানো যায় না, ফলে পুরো প্রক্রিয়াই বন্ধ হয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, আমরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করি, কিন্তু ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে তা দীর্ঘ সময় চালিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খরচও বেড়ে যাচ্ছে। একটি চা বাগান পরিচালনা করতে প্রতিদিন বিশাল ব্যয় হয়—শ্রমিকদের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের টাকা লাগে। কিন্তু উৎপাদন কমে গেলে সেই ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে চা শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।
ভৈরবে ‘দেশ রূপান্তর’-এর ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটলেন পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী